বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৮Dedicate To Right News
Shadow

দিনু প্রামানিকের ভ্রমণ কাহিনী “পথ চলতে পথ শিখতে”

Spread the love

তাড়াহুড়ো করে প্রধান কার্যালয়ের কাজ সেরে বিকেল চারটা নাগাদ রওনা দিলাম। মতিঝিল থেকে রিক্সা নিয়ে গুলিস্থান এবং সেখান থেকে বিআরটিসি এসি বাস ধরে মাওয়া। স্পীডবোর্ডে কাঁঠালবাড়ীঘাট নেমে আবার বিআরটিসি ধরে আপন কর্মস্থল। এ আমার নিত্য মাসান্তের যাতায়াত রুট। মাওয়া রুটে লোকাল যাতায়াত অভ্যাস আমার অনেক দিনের। সেদিনও মাওয়া নেমে নির্ধারিত কাউন্টার থেকে টোকেন নিয়ে স্পীডবোর্ডে উঠতেই দেখি একজন বোরকা পরা মেয়ে স্পীডবোর্ডের প্রথম সারির লাইনে বসে আছে। সবসময় আমি প্রথম সারিতে বসলেও সেদিন দ্বিতীয় সারি তথা আমি তার পিছন সিটে বসি। মেয়েটা দু’তিনবার পিছন ঘুরে আমাকে দেখে নিল। হয়তবাঃ আশা করছিল আমি তার পাশের সিটেই বসি। বোরখা পড়া মেয়ে তাই এত ভাল করে খেয়াল করা হয় নাই। প্রয়োজন মত যাত্রী উঠার পর স্পীডবোর্ড ছেড়ে দেয়। যথারীতি স্পীডবোর্ডে নদীর পাড় হয়ে, এপাড়ে ঘাটে নামতেই, মেয়েটি বলল, প্লিজ হেল্প মি।
নরম সুরের মিষ্ঠি কথা আমি ফেলতে পারিনি। কোন কথা না বাড়িয়ে, আমিও নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিলাম। সে আমার হাতটি ধরে স্পীডবোর্ড থেকে ঘাটের প্লাটুনে নামল।
– কোথায়, যাবেন?
আমি আমার গন্তব্যস্থান বলতে তিনিও সেখানেই যাবেন।
– আমিও।
– আমার সাথে যেতে পারবেন।
মেয়েটি কোন কথা না বাড়িয়ে, আমার সাথে পা বাড়ালেন। বিআরটিসি কাউন্টারে এসে শুনি এপারে এটাই শেষ ট্রিপ। কপালে জুটল শেষ দু’খানা টিকেট। আপাততঃ সেটা নিয়েই খুশি। মেয়েটা আমার সাথে বাসে উঠে জানালার ধারের সিট দখল করে বসল। বোরখাপরা মেয়েটি হাতে পায়ে মোজা পরা।
বাসে ঝালমুড়ি, চানাচুর আর বাদাম বিক্রেতা হকার উঠছে। মেয়েটার অনুমতি নিয়ে বিশ টাকার বাদাম কিনে তার হাতে দিলাম। ইতিমধ্যে, বাস ছেড়েছে। মেয়েটা এখনও বাদামের প্যাকেট হাতে বসে আছে। নাম কি, বলতেই চট করে উত্তর দিল, ডালিয়া।
– ঢাকা কেনো গিয়েছিলেন?
– একটা চাকরীর ইন্টারভিউ ছিল।
– একা কেনো?
– একা না, ভাইয়া ঢাকা থাকেন। আমি উনার বাসাতেই ছিলাম। ভাইয়া, আমাকে মাওয়া পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গেছে।
– ডালিয়া, তুমি বাদাম খাও না কেনো?
– আপনি ছাড়া আমি কিভাবে খাব?
বাহ্, চমতকার অতিথি পরায়ণ মেয়েতো। আমি অবাক হয়ে ডালিয়ার দিকে চেয়ে থাকলাম। এবার মেয়েটি মুখ থেকে ঘোমটা সরাল। দেখতে যেনো এক পরী।
ইতিমধ্যে বাসের সুপারভাইজার টিকেট এবং যাত্রী চেকিং কাজ শেষ করেছে। বাসের গেট সহায়তাকারী বাসের দরজায় দু’তিনবার হাতের তালুতে জোরে জোরে শব্দ করে, ওস্তাদ বের হন। ড্রাইভার হর্ণ বাজিয়ে বাস চালু করলেন। স্টপেজ থেকে বের হয়ে, আঁকাবাঁকা রোড় পার হয়ে আমাদের গাড়ী মেইন রাস্তঅয় এসে পড়ল। গাড়ীর গতিও বেশ বেড়ে গেছে। আমাদের বাস চলছে। ডালিয়া খোঁসা এড়িয়ে বাদাম দিচ্ছে আর আমি কি মজাই মজাই খাচ্ছি। আমি বাদাম খাচ্ছি আর বামহাতে বসা ডালিয়া’কে দেখছি। মাঝে মাঝে দু’জন একসাথে জানালার বাইরের দূশ্যগুলি দেখছি। আধুনিক ফোরলেন সড়কের কাজ চলছে। মাদারীপুর জেলার অংশে রাস্তার কাজ প্রায়ই সম্পন্ন। রাস্তার মাঝখানের অংশে সুন্দর সুন্দর ফুল গাছ লাগানো। কি ফুল হবে। সম্ভবতঃ ডালিয়া ফুল। রাস্তার দু’ধারে বিস্তীন ফাঁকা মাঠ। প্রসস্থ রাস্তায় কোথাও আন্ডারপাস, কোথাও ওভারব্রীজ আবার কোথাও পাশ্বরাস্তা। আমাদের বাস ছুটে চলছে বেম গতির সাথেই। এসি বাসের ঠান্ডা হাওয়া, রাস্তার পাশের মনভুলানো দূশ্য আর পাশের মিষ্ঠি মেয়ে ডালিয়ার হাতের খোঁসা সরানো বাদাম খেতে খেতে কখন যেনো ঘোরের মধ্যে ঘুমিয়ে গেছি। যখন ঘুম থেকে জেগে উঠি, দেখি আমি হাসপাতালের বেডে। হাতে স্যালাইনের নল লাগানো। আঙ্গুলের আংটি, হাতের ঘড়ি, পকেটের মানিব্যাগ, সাইড ব্যাগ সব কোথায় যেনো হারিয়ে গেছে। আমি তখন আর কিছুই মনে করতে পারছিলাম না। মাথাটার মধ্যে শুধু বোঁ বোঁ করে শব্দ করে আর সমস্ত পৃথিবীটা তখন আমার চারপাশে ঘুরছিল। ঝাপসা ঝাপসা মনে হচ্ছিল সে মেয়েটার কথা, ডালিয়া। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে অস্ফুট কন্ঠে জড়ানো গলায় বের হল, ডালিয়া। হাসপাতলের বেডে মাথার পাশে বসা বউ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হুঁ, চল বাসায় আগে। তার চোখে চোখ পড়তেই আমি আঁতকে উঠি।

—-

  • হরিরামপুর যাচ্ছি

এবারের ঈদে বন্ধু আরজু’র সাথে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ীর দিকে রওনা দিলাম। দু’জনের পরিবার আগের সপ্তাহে চলে যাওয়ায় আমরা দু’জন খুব মজাই মজাই যাবো। বন্ধু আরজু খুব সোজা সরল মানুষ। কোন সাত- পাঁচ, ঊল্টা পাল্টা ৰোঝে না। দেখতে পাতলা ছিপছিপে হালকা শরীর, কালো মোটা ফ্রেমের চশমা পরে সবসময়। ওর ঐকালো রঙের চশমা পরায়, আমরা সেই ছাত্রজীবন থেকেই বন্ধু মহলে ‘কানা’ বলে ডাকাডাকি করি।

টানা দশদিন ছুটির আমেজ নিয়ে শুক্রবার সকাল আটটায় দু’জন গাবতলী বাস টার্মিনাল পৌঁছালাম। এত সকালে এত লোকের ভীড় যা আমাদের অবাক করে। যা ভেবেছিলাম, তার চেয়েও অধিক মানুষ। পিঁপড়ার মতন লোকজন ঢাকা ছেড়ে নাড়ীর টানে ছুটছে। শেষ মূর্হূতে কয়েকটা বাস কাঊন্টার ঘুরে টিকিট না পেয়ে ব্যর্থ হয়ে দু’জন লোকাল বাসের ধারে গেলাম। নব্বই টাকার ভাড়া তিনশ টাকা। গাবতলী থেকে পাটুরিয়া। ঢাকা শহরের সব গাড়ী আজ এই রাস্তায়। রঙিন কাগজে সাইন বোর্ড মতন করে টানানো লোকাল বাসের সামনের গ্লাসে বড় করে লেখা ‘পদ্মা লাইন’ দেখে, দু’জন ঊঠে পড়লাম। আমাদের মনে হলো, এটা লোকাল গাড়ীর মধ্যে একটু ভাল মানের হবে। গাড়ী ছেড়ে দিল। গাবতলী- পাটুরিয়া রোডে প্রচুর জ্যাম থাকায়, আমাদের বাস সিংগাইল এর দিকে টান দিল। কিছুদূর গিয়ে, গাড়ীতে টানানো কাগজের সাইন বোর্ডে লেখা, ‘পদ্মা লাইন, গাবতলী টু পাটুরিয়া’ খুলে ফেলল। এবার গাড়ীর গ্লাসে সাদা চুনে বড়বড় করে লেখা হলো, ঢাকা- হরিরামপুর। আমাদের পাটুরিয়ার গাড়ী চলতে লাগল, হরিরামপুর দিকে। আমাদের’কে ড্রাইভার, হেলপার, সুপারভাইজার ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলেন। আমরা সবাই, তখন হরিরামপুর দিকে যাচ্ছি।

মানিকগঞ্জ হাইওয়ে প্রচুর জ্যাম। এটা একটা বাইপাস রাস্তা। সামনে পুলিশের চেকপোষ্ট আছে। যদি তারা বুঝতে পারে গাড়ী পাটুরিয়া যাচ্ছে, তবে গাড়ি শুদ্দ সবাইকে ফেরত পাঠাবে। ড্রাইভার, হেলপার, সুপারভাইজার সবার কাছে হাতজোড় করে বললেন, আপনারা সবাই বলবেন, এটা রির্জাভ গাড়ী, মিরপুর থেকে আসলাম। আমরা সবাই হরিরামপুর যাচ্ছি। তবেই, পার পাওয়া যাবে, নতুবা আমাদেরকে ফেরত আসতে হবে এবং পাটুরিয়া যেতে দশ থেকে বার ঘন্টা লাগবে। আপনারা সবাই এই কথাটা বললে, আমরা দ্রুত যেতে পারব।

দেখতে দেখতে আমাদের গাড়ী পুলিশের চেকপোষ্টের কাছে আসল। আমাদের সামনের দু’টি গাড়ী ফেরত পাঠানো হলো। এবার আমাদের সিরিয়াল। ড্রাইভার, হেলপার পুলিশের কর্তাকে বারবার বলছে, স্যার আমরা হরিরামপুর যাব, হরিরামপুর। যাত্রীদের থেকেও শুনতে পারেন, স্যার।

পুলিশ গাড়ীর মধ্যে ঊঠতেই, সবাই সম্বস্বরে বলল, এটা রির্জাভ গাড়ী, আমরা হরিরামপুর যাচ্ছি।

পুলিশ আমার পাশে বসা বন্ধু আরজু’র দিকে তাকাল। আরজু খুব কাঁপাকাঁপি শুরু করল। ওর অবস্থা দেখে, মনে হচ্ছিল, ও কোন খুনের ফেরারী আসামী। পুলিশ সবাইকে চুপ করতে বলল। সবার ভিতর তখনও একধরণের ঊৎকন্ঠা।

পুলিশ সুন্দর করে, আরজু’কে বলল, তোমরা কোথায় যাচ্ছো। গাড়ীটা কোথায় যাবে, সত্য করে বলতো, বাবা।

আরজু কাঁপতে কাঁপতে বলল, পাটুরিয়া।

তখন শুরু হলো, আরজু আর আমার ঊপর পাবলিকের কিল, থাপ্পড় আর চোখ রাঙানী। কেও কেও রাজাকার বলেও সম্বোধন করল।

সে যাত্রায় পুলিশের সহায়তা পুলিশের গাড়িতে আমরা দু’জন নিরাপদে পাটুরিয়া পৌঁছুলেও হরিরামপুরের সেই গাড়ী আর হরিরামপুর রাস্তায় যেতে পারেনি। সেখান থেকে জরিমানাসহ তাদেরকে ফিরতি পথে যেতে হয়েছিল।#

0 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *