সোমবার, মে ২৭Dedicate To Right News
Shadow

মা হলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দার্শনিক

Spread the love
  • অধ্যাপক ড. মো: গোলাম ছারোয়ার

কথা সাহিত্যিক হুমায়ন আহমেদের কথা দিয়েই শুরু করি ‘মা হলো পৃথিবীর একমাত্র ব্যাংক যেখানে আমাদের সব দু:খ কষ্ঠ জমা রাখি আর বিনিময়ে নেই বিনাসুদে অকৃত্রিম ভালোবাসা । পৃথিবীর সকল ভালোবাসার মধ্যেই কোন না কোন স্বার্থ জড়িত থাকে । মিশে থাকে কৃত্রিমতা । কিন্তু মায়ের ভালোবাসা এমনই এক ভালোবাসা যার মধ্যে স্বার্থ, কৃত্রিমতা ,অভিনয় লোক দেখানোর কোনই স্থান নেই,সন্তান বাহির হতে ঘরে ফিরে এলে স্ত্রী, ছেলে বা অন্য যেকোন প্রিয় আত্বীয় স্বজনের সুতীক্ষè দৃষ্টি যদি থাকে তার সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় জিনিসটি তার হাতে আছে কিনা বা তাদের জন্য কি ধরনের উপহার সামগ্রী নিয়ে আসলো তার দিকে। কিন্তু মা’র নজর থাকে সন্তানের মুখের দিকে,তাঁর প্রিয় সন্তানটি ঠিক মত খেয়েছে কিনা । মুখটা কেমন শুকনা শুকনা লাগছে । পৃথিবীর এই একজন মানুষই আছেন যার সবটুকু দিয়েই সম্পর্ন পরিতৃপ্ত সন্তানের মঙ্গলে। একজন সন্তান যতই আবদার করুক হাসি মুখে তা পুরনের আধার হলেন মা ।

আজ হতে ১১৭ বছর পুর্বে ১৯০৭ সালে শুরু হয়ে ১৯১৪ সালে আর্ন্তজাতিক মা দিবস হিসাবে মে মাসের ২য় রবিবার প্রতিপালিত হয়ে আসছে । সম্মান জানাই আমেরিকার ওয়ে®ট ভার্জিনিয়ার সেই অ্যান ও তার মেয়েকে । যাঁরা পৃথিবীর সকল মানুষকে এই দিনটিতে মাকে স্বরন করে শ্রদ্ধা জানাই ভালোবাসায় নিমঁিজ্জত রাখার জন্য । সকল ধর্মেই মাকে আর্শিবাদ স্বরুপ বলা হয়েছে । সবচাইতে ছোট অথচ সবচাইতে দীর্ঘ ও গভীরতম অনুভুতির নামই হল মা । মুসলমানদের পবিত্র ধর্ম ইসলামের একটি স্তম্ভের নাম হজ্জ। বর্তমানে পবিত্র হজ্জে যাওয়ার মৌসুম চলছে । অনেক অর্থ খরচ করে অনেক পরিশ্রম করে সকল অনুশাসন মেনে পবিত্র হজ্জ ব্রত পালন করতে হয় । কিন্তু কেহই হজ্জে মাবরুর এর গ্যারান্টি দিতে পারবে না। অর্থ্যাৎ তার হজ্জ কবুল হবে কিনা তা একমাত্র আল্লাহ পাকই ভালো জানেন ।

কিন্তু বায়হাকি-মিশকাত শরীফে বর্নিত আছে ‘যখন কোন অনুগত সন্তান নিজের মা-বাবার দিকে অনুগ্রহের দৃষ্টিতে দেখে ,আল্লাহ তায়ালা তার প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে একটি করে কবুল হজ্জের সাওয়াব দান করেন’ । এমন বরকতময় নিয়ামত হলো মা । হাদিসে কুদসিতে বলা হয়েছে । মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের জান্নাত । নাড়ি ছেঁড়া ধন বলতে আমরা স্পষ্টত বুঝি মায়ের শরীরে সাথে সন্তানের এক অমোঘ সর্ম্পক যা কখনই ছিন্ন হওয়ার নয় । তাই তো বলা হয় দূর দেশে যদি সন্তানের কোন অমঙ্গল হয় সবার আগে যার মনে আঘাত লাগে তিনিই হলেন মা । নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও যিনি সন্তানের মঙ্গল চান তিনিই হলেন মা । ধনী-গরীব, শিক্ষিত -অশিক্ষিত, মালিক -মজুর সকল শ্রেনীর মায়ের অনুভুতি একই আর তা হলো চরম -মায়া-মমতা, ভালোবাসা আর মমত্ববোধের ।

সন্তান যখন অসুস্থ হয় তখন তার সার্বিক সুস্থ্যাতার জন্য যে আকুল বেকুল ও কাতর প্রান মানুষটি ছটফট করেন তিনিই হলেন মা। তাই তো কোন এক পল্লী মায়ের আকুতিভরা মনের বহি:প্রকাশ ঘটিয়েছেন পল্লী কবি জসিম উদ্দিন তাঁর পল্লী জননী কবিতায় এভাবে –

পান্ডুর গালে চুমু খায় মাতা ,সারা গায়ে দেয় হাত
পারে যদি বুকে যত স্নেহ আছে ,ঢেলে দেয় তারি সাথ

মায়ের পাগল পাড়া মনের আরাধ্য শুধুই সন্তানের মঙ্গল । মা যখন সন্তাকে তাঁর পেটে ধারন করেন, তখন মার শরীর হতে প্লাসেন্টার মাধ্যমে সন্তানের শরীরে খাদ্য ও পুষ্টির সাথে সরবরাহ হয় ভালোবাসা মায়া ,মমতার সুখানুভূতি। এমন মায়ার জালে আবদ্ধ সন্তানের সামান্যতম ক্ষতি কি করে মা সহ্য করতে পারে । সন্তান ভুমিষ্ঠের পর মায়ের কাছে মনে হয় তার ভালোবাসার পবিত্রতম নিয়ামত সৃষ্টিকর্তা তাঁকে দান করেছেন । মহামুল্যবান সম্পদ লাভের পর সেই সম্পদের সুরক্ষায় অতিতৎপর মা । কোন ভাবেই, কোন কিছুর বিনিময়ে তাই মা এই মুল্যবান সম্পদ হাত ছাড়া করতে চান না । সকল ত্যাগ আর কষ্টের বিনিময়ে মা তিল তিল করে গড়ে তোলেন তাঁর বুকের ধনকে । শত অপরাধও মা হাসিমুখে সহ্য করেন । তাইতো কালো-ফর্সা, খাটো-লম্বা, ল্যাংড়া, বোবা, অন্ধ কোন সন্তানই তার মায়ের কাছে অপছন্দের নয়। কোন সন্তানই তার মায়ের কাছে অসুন্দর নয় । সন্তান বড় হওয়ার সাথে সাথে মায়ের শঙ্কাও বেড়ে যায় । সন্তানকে যথাযথ ভাবে মানুষ করতে পারছেন কিনা এই ভেবে ।

বিনিন্দ্র রজনী সন্তানের পাশে কাটিয়ে দেন সন্তানকে একটি মর্যাদার আসনে আসীন করার জন্য । কারন মায়ের মনের একটাই প্রর্থনা আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। তারপর সন্তানের যখন বিয়ে দেন নাতি -নাতনীর মুখ দেখার জন্য। মায়েরা সকল ত্যাগ স্বীকার করেন সন্তান ও নাতি -নাতনীর মুখের দিকে তাকিয়ে । এই পরম সহিঞ্চু মহামানবীদের বর্তমান অবস্থা যদি পর্যবেক্ষন করা হয় তাহলে তা সত্যিই দু:খজনক ও অনাকাঙ্খিত । বর্তমানে আধুনিকতার নামে মা-বাবার উপর আদুরের সন্তানদের যে নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতা তা হৃদয় বিদারক ও অমানবিক । বয়স্ক মা বিশেষ করে যাঁদের বয়স ৬০ বছরের বেশী । উনাদের মাঝে যাঁরা বিধবা তাদের তো কষ্টের কোন সীমা-পরিসীমা নেই । এই মায়েরা নানা ধরনের শারিরীক সমস্যায় জর্জরিত । ডায়াবেটিক্স, হার্টের রোগ, কিডনী রোগ, হাড়েঁর রোগ প্রভৃতি জটিল জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে চরম দুর্ভোগের মধ্যে নিদারুন কষ্টে জীবন অতিবাহিত করছেন । তার উপর আছে সন্তান সম্ভতির সম্পদের লালসার লেলিহান শিখা । সম্পদের অভাবে বৃদ্ধা অসুস্থ মাকে নির্যাতনের মাধ্যমে তা ভোগ দখলে নিতে মমতাময়ী মাকে মারধর করতেও কেন জানি আমরা কুন্ঠাবোধ করি না ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বয়স্ক ও বিধবা ভাতা চালু করেছেন । এসডিজি এর নির্ধারিত গোল অর্জনে আমরা সবাই মিলে কাজ করছি । তাই দেশব্যাপি এই দুদর্শাগ্রস্থ মায়েদের সাবিক পরিসংখ্যান নিধারন করে তাঁদের সবাইকে যথাযোগ্য মর্যদা প্রদান পূর্বক সুস্থ জীবনে ফিরে আনতে বাংলাদেশ সরকারের সাথে সাথে আমাদের নিজেদের মানবিকতাকে শানিত করার বিকল্প নেই । গবেষনায় দেখা গেছে মারা যখন ৭০ উদ্ধ বয়সে পৌছে যান তখন তাদের অনেক অঙ্গ প্রতঙ্গ সঠিক ভাবে কাজ করে না । তাঁদের অনুভুতি একেবারে শিশুদের মত হয়ে যায় ।

এমতাবস্থায় তাদের সাথে ঠিক ব্যবহার করতে হবে যেমন ব্যবহার তাঁরা আশা করেন । সেজন্যই আল্লাহ পাক বলেছেন ‘আর তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমার তাকে ছাড়া অন্য কারও উপাসনা করো না এবং তোমরা পিতা-মাতার প্রতি সদাচারণ করো। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়ে যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হন, তাহলে তুমি তাদের প্রতি উহ্ শব্দটিও উচ্চারণ করো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না। তুমি তাদের সঙ্গে ন¤্রভাবে কথা বলো। আর তাদের প্রতি মমতাবশে স্নেহতার পক্ষপুট অবনমিত করো এবং বলো, হে আমার প্রতিপালক! তুমি তাদের প্রতি দয়া করো যেমন তারা আমাকে শৈশবে দয়াপরবশে লারন-পালন করেছিলেন।’

মায়ের দোয়া সন্তানের জন্য অবধারিত কবুলিয়াতের দোয়া । অন্য কারও দোয়া কবুল হতেও পারে, নাও হতে পারে । কিন্তু সন্তানের জন্য মায়ের দোয়া নিশ্চিত কবুল । তাই এই আর্শিবাদের আধার হতে যত বেশী আর্শিবাদ গ্রহন করতে পারবো তত বেশী মঙ্গল অর্জিত হবে দুনিয়াতে ও পরকালে । আর যদি অর্শিবাদের পরির্বতে কোন কষ্টের উহ্ শব্দটিও উচ্চারিত হয়, তবে নিশ্চিত ধ্বংসের দ্বারপ্রন্তে পৌঁছাতে সামান্যতমও সময় লাগবে না । এই সন্তানটিই আগামীতে বাবা-মা হবেন । তাই আসুন যাদের এই মহামানবটি বেঁচে আছেন তাঁদের খেদমত করে হযরত ওয়ায়েছ করনী (রা:) এর মত আল্লাহও রাসুলের প্রিয়পাত্র হিসাবে নিজেকে কবুল করিয়ে চিরস্থায়ী সাফল্য অর্জনে সচেষ্ঠ হই ।

লেখক: অধ্যাপক ড. মো: গোলাম ছারোয়ার, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত¡ বিভাগ, জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম), মহাখালী, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *