- রেজাউর রহমান রিজভী
কিছু দিন পূর্বে ঢাকার মিরপুরে ঘটে যাওয়া শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। এমন নির্মম ঘটনা যখন বারবার ঘটে, তখন প্রশ্ন ওঠে—এ দায় শুধু একজন বিকৃত মানসিকতার অপরাধীর, নাকি রাষ্ট্র ও সমাজও এর দায় এড়াতে পারে না? “রামিসা হত্যাকাণ্ড: ব্যক্তির দায় বনাম রাষ্ট্রের দায়” প্রশ্নটি তাই আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, ব্যক্তির দায় অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। যে ব্যক্তি একটি নিষ্পাপ শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছে, সে শুধু আইন ভঙ্গ করেনি, মানবিকতার সবচেয়ে ভয়ংকর সীমালঙ্ঘন করেছে। এমন অপরাধীর জন্য কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। কারণ বিচারহীনতা কিংবা দীর্ঘসূত্রতা সমাজে ভুল বার্তা দেয়। যখন অপরাধীরা দেখে যে প্রভাব, অর্থ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শাস্তি এড়ানো সম্ভব, তখন অপরাধের ভয় কমে যায়। তাই ব্যক্তিগত অপরাধের দায় সম্পূর্ণভাবে অপরাধীর কাঁধেই বর্তায়।
কিন্তু এখানেই আলোচনা শেষ হয়ে যায় না। কারণ একটি সমাজে যদি ধারাবাহিকভাবে শিশু ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা বাড়তে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটি কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিফলন। একজন অপরাধী হঠাৎ করে জন্ম নেয় না। পরিবার, সমাজ, শিক্ষা ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নানা দুর্বলতা তাকে বিকৃত মানসিকতায় গড়ে উঠতে সহায়তা করে।
রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একটি শিশু যদি নিজের বাসার আশপাশেও নিরাপদ না থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। বাংলাদেশে প্রায়ই দেখা যায়, শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হলেও তদন্ত ধীরগতির হয়, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহে গাফিলতি থাকে এবং বিচার দীর্ঘসময় ঝুলে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহলের চাপও কাজ করে। ফলে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। এই সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে।
শুধু আইন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের কাজ। বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন রয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো—আইনের বাস্তব প্রয়োগ কতটা দৃশ্যমান? যদি দ্রুত বিচার ও দৃশ্যমান শাস্তির সংস্কৃতি গড়ে উঠত, তাহলে অনেক অপরাধী হয়তো অপরাধ করার আগেই ভয় পেত।
রাষ্ট্রীয় দায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক সচেতনতা তৈরিতে ব্যর্থতা। আমাদের সমাজে যৌন সহিংসতা নিয়ে এখনও খোলামেলা আলোচনা হয় না। শিশুদের “গুড টাচ-ব্যাড টাচ” শিক্ষা দেওয়া হয় না পর্যাপ্তভাবে। পরিবারগুলো অনেক সময় বিষয়টিকে লজ্জা বা সামাজিক অসম্মানের ভয়ে চেপে যায়। ফলে অপরাধীরা সুযোগ পেয়ে যায়। রাষ্ট্র যদি শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শিশু নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও মানবিকতা বিষয়ে কার্যকর শিক্ষা চালু করত, তাহলে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও বদলাতে পারত।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বিকৃত ও সহিংস কনটেন্ট সহজলভ্য হয়ে পড়ছে। অনলাইনে পর্নোগ্রাফি, সহিংসতা ও নারীর প্রতি অবমাননাকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বিকৃত কনটেন্টে আসক্তি মানুষের মানসিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এমন বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে শুধুমাত্র কনটেন্টকে দায়ী করলেই হবে না; পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক মূল্যবোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঘটনায় সমাজের দায়ও কম নয়। আমরা অনেক সময় অপরাধের পর ক্ষোভ প্রকাশ করি, মানববন্ধন করি, সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাই; কিন্তু কিছুদিন পরই সব ভুলে যাই। আমাদের সমাজে এখনও ভুক্তভোগীকেই অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। শিশু ও নারীর নিরাপত্তাকে পারিবারিক নয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ইস্যু হিসেবে দেখার মানসিকতা এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। শিশু ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় যদি রাষ্ট্র সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করত, তাহলে মানুষের আস্থা বাড়ত। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক বড় ইস্যুও কয়েকদিন পর চাপা পড়ে যায়। ফলে মানুষ মনে করে, বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা কম। এই হতাশা সমাজের জন্য ভয়ংকর।
রামিসার মতো শিশুদের মৃত্যু আমাদের সামনে একটি কঠিন সত্য তুলে ধরে—আমরা নিরাপদ সমাজ গড়তে ব্যর্থ হচ্ছি। এখানে ব্যক্তির দায় যেমন চূড়ান্ত, তেমনি রাষ্ট্রের দায়ও অস্বীকার করার উপায় নেই। কারণ রাষ্ট্র শুধু আইন প্রয়োগকারী একটি কাঠামো নয়; এটি নাগরিকের নিরাপত্তা, শিক্ষা, ন্যায়বিচার ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্বও বহন করে।
সমাধানের জন্য কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। প্রথমত, শিশু নির্যাতনের মামলায় দ্রুত তদন্ত ও বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্কুল পর্যায়ে শিশু সুরক্ষা ও যৌন সহিংসতা বিষয়ে বয়স উপযোগী শিক্ষা চালু করতে হবে। তৃতীয়ত, পরিবারকে শিশুদের সঙ্গে খোলামেলা সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যেন শিশুরা ভয় না পেয়ে কোনো অস্বস্তিকর ঘটনা জানাতে পারে। চতুর্থত, সমাজে নারী ও শিশুকে “দুর্বল” নয়, পূর্ণ মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে দেখার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। পঞ্চমত, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
রামিসার হত্যাকাণ্ড কেবল একটি সংবাদ নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবিকতার জন্য এক গভীর প্রশ্ন। আমরা কি শুধু অপরাধীর ফাঁসি চেয়ে ক্ষোভ ঝাড়ব, নাকি এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলব যেখানে আর কোনো শিশুকে এভাবে প্রাণ হারাতে না হয়? যদি আমরা শুধুই ব্যক্তিকে দায়ী করে থেমে যাই, তাহলে সমস্যার মূল কারণগুলো অদৃশ্যই থেকে যাবে। আবার যদি ব্যক্তিগত দায়কে আড়াল করে সব দায় রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দিই, তাহলেও ন্যায়বিচার পূর্ণতা পাবে না।
সত্য হলো—এই দায় যৌথ। অপরাধীর দায় অপরিসীম, কিন্তু সেই অপরাধ ঠেকাতে ব্যর্থ রাষ্ট্র ও সমাজও দায়মুক্ত নয়। রামিসার জন্য ন্যায়বিচার মানে শুধু একজন অপরাধীর শাস্তি নয়; এমন একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশুর বাবা-মাকে আর এভাবে সন্তানের লাশ বুকে নিতে না হয়।
লেখক: সম্পাদক, দ্য স্টেটমেন্ট২৪ ডট কম