- লিটন আব্বাস
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান সমকালীন বৈশ্বিক ইতিহাসের পৃষ্ঠায় রক্তক্ষয়ী বিপ্লব হিসেবে খোদাই হয়ে থাকবে।
জুলাইয়ের ১৬ তারিখ থেকে শুরু করে ৪ ও ৫ আগস্ট নিয়ে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত দেড়হাজারের বেশি ছত্রি-জনতা-শিশু-নারী ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ ফ্যাসিবাদী সরকারের গুলিতে শহীদ হন।
উল্লেখ্য, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করা শিক্ষার্থী আবু সাঈদ তিনি ১৬ জুলাই ২০২৪ তারিখে রংপুরে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। আবু সাঈদের ওপর পুলিশের নির্মম গুলির দৃশ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সেইসময় ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল এং তৎকালীন সরকারের ভিত একপ্রকার সেইদিনই ভাঙা হয়ে গিয়েছিল। একই দিনে
চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরাম চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে সংঘর্ষে শহীদ হন এবং ফয়সাল আহমেদ শান্ত ওমরগনি এমইএস কলেজের শিক্ষার্থী ১৬ জুলাই ২০২৪ তারিখে চট্টগ্রামে শহীদ হন।
১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ঢাকায় আন্দোলনকারীদের মাঝে পানি ও বিস্কুট বিতরণের সময় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। একই দিনে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারহান ফায়াজ মোহাম্মদপুরে শহীদ হন। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (MIST)-এর শিক্ষার্থী শেখ আশাবুল ইয়ামিন ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে সাভারে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন।
ইমন হাসান আকাশ: ঢাকার মিরপুরে কর্মরত একজন ক কুরিয়ার সার্ভিসকর্মী। ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন।
—গণঅভ্যুত্থানে অন্তত ১৩৩ জন শিশু ও কিশোর শহীদ হয়, যাদের অনেকেই সরাসরি আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল এবং ঘরের ভেতর গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (UNCRC) এবং বাংলাদেশের জাতীয় শিশু নীতি অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী যেকোনো মানবসন্তানই শিশু হিসেবে গণ্য হয়।
মো. সিয়াম (১৫) ছিলেন আন্দোলনের প্রথম শিশু শহীদ। ১৭ জুলাই ২০২৪ তারিখে ঢাকার মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। ৬ বছর বয়সী রিয়া গোপ ১৯ জুলাই ২০২৪ তারিখে নারায়ণগঞ্জের নয়ামাটি এলাকায় নিজের বাসার ছাদে খেলার সময় মাথায় গুলি লেগে শহীদ হন। ১০ বছরের শিশু সাফকাত সামির ঢাকার মিরপুরে নিজ বাসার ভেতরে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
১৬ বছর ২ মাস ১৩ দিনের গোলাম নাফিজ ঢাকার ফার্মগেট-খামারবাড়ি এলাকায় ৫ আগস্ট ২০২৪ (সরকার পতনের দিন) আন্দোলনে অংশ নিয়ে রিকশার ওপর গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
৪ বছরের আবদুল আহাদ অন্তত ১৩২ জনের বেশি শিশু ও কিশোর ২০২৪ সালের জুলাইয়ের বিক্ষোভে প্রাণ হারায়।
—মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী এই আন্দোলনে অন্তত ১১ জন নারী শহীদ হন।
১৬ বছর বয়সী নাঈমা সুলতানা মাইলস্টোন স্কুলের দশম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে উত্তরায় নিজ ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। তিনি আন্দোলনের প্রথম নারী শহীদ।
২০ জুলাই ২০২৪ তারিখে ২০ বছরের সুমাইয়া আক্তার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আড়াই মাসের সন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে বারান্দায় যাওয়ার পর মাথায় গুলি লেগে ঘটনাস্থলেই মারা যান। ১৯ বছরের লিজা আক্তার রাজধানীর শান্তিনগরে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখে বারান্দায় দাঁড়ানো অবস্থায় পেটে গুলি লাগে এবং ২২ জুলাই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
১৭ বছরের রিতা আক্তার দুয়ারীপাড়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে মিরপুর ১০ নম্বরে আন্দোলনের সময় মাথায় গুলি লেগে শহীদ হন।
মেহেরুন্নেসা ১৯ জুলাই তাঁর ভাই শহীদ হওয়ার পর ৫ আগস্ট ভাই হত্যার বিচার চেয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে সড়কে দাঁড়িয়েছিলেন। বাড়ি ফিরে ফোনে কথা বলার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
—ছাত্রদের এই আন্দোলন পরে ছাত্র-জনতার আন্দোলন হযে ওঠে এবং গণঅভুত্থানে রূপ নেয়। এই গণআন্দোলনে ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে ও ঢাকার বাইরে সাধারণ শ্রমিক, দিনমজুর ও রিকশাচালকদের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক।
মো. ফারুক ছিলেন চট্টগ্রামের ষোলশহরে একটি চেয়ারের দোকানের কর্মচারী। আন্দোলনের শুরুর দিকে ১৬ জুলাই ২০২৪ তারিখে তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। কুরিয়ার সার্ভিস কর্মী ইমন হাসান আকাশ ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে ঢাকার মিরপুরে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। রাসেল মিয়া সাভার এলাকার একজন পোশাক কারখানা (গার্মেন্টস) শ্রমিক। ৫ আগস্ট সাভারে আন্দোলনকারীদের সাথে থাকার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ কিংবা ‘রক্তাক্ত বসন্ত’ রূপে আখ্যায়িত এই আন্দোলন কেবল নির্মম স্বৈরাচারী শাসনের অবসানই ঘটায়নি, বরং দীর্ঘ রুদ্ধশ্বাস দমবন্ধ পরিবেশ থেকে বাংলাদেশকে নতুন ঐতিহাসিক অধ্যায়ে মুক্ত করেছে। কিশোর-তরুণদের বুক পেতে দেওয়া, দেওয়ালে দেওয়ালে গ্রাফিতির অক্ষরে ক্ষোভের প্রকাশ আর রাজপথে বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে শ্লোগান তোলার সেই দিনগুলো ছিল মর্মান্তিক ক্যানভাস।
কিন্তু সেই ঐতিহাসিক অর্জনের দুই বছর পর, ২০২৬ সালের মধ্যভাগে এসেও বিপ্লবের মূল রূপকার—শহীদ পরিবার এবং প্রায় ২৪ হাজার আহত মানুষের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া গভীর মানবিক ও কাঠামোগত সংকটে স্থবির হয়ে আছে। দীর্ঘ ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের প্রথম দুই মাসের সময়কাল অতিক্রান্ত হলেও এই বিপুল সংখ্যক বীর যোদ্ধার একটি বড় অংশ আজ অবহেলিত, নিভৃত ক্রন্দনে নিমজ্জিত।
—ল্যাটিন আমেরিকার মেঠো বিপ্লব, ফরাসি ইতিহাসের রাজপথ কিংবা আরব বসন্তের রক্তাক্ত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেকোনো গণ-অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হয় তার ‘ক্ষত নিরাময়’ এবং ‘সংক্রমণকালীন ন্যায়বিচার’ প্রক্রিয়ায়। বাংলাদেশ আজ সেই ইতিহাসের কঠিন ও নির্মম কাঠগড়াতেই দণ্ডায়মান।
—বিপ্লবোত্তর রাষ্ট্র পরিচালনায় যে আমূল সংস্কার বা ‘রেভোলিউশনারি ডাইনামিজম’ অপরিহার্য ছিল, প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামো তা ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতেও প্রথাগত নিয়মের কঠোর ও যান্ত্রিক প্রয়োগ ভুক্তভোগীদের জন্য চরম ব্যথা-বেদনা নিয়ে এসেছে।
—হাসপাতালে শয্যাশায়ী গুরুতর আহত ও পঙ্গু মানুষের এককালীন রাষ্ট্রীয় অনুদান প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আটটি ভিন্ন প্রশাসনিক স্তরের ছাড়পত্র, হাসপাতালের পরিচালকের সিলমোহর এবং বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তার প্রত্যয়নপত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
—এই আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দেওয়াল প্রান্তিক মানুষের জন্য দুর্ভেদ্য প্রাচীর সমতুল্য। ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা গ্রামীণ, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য জটিল ইংরেজি ওয়েবসাইট এবং ডিজিটাল ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চোখের দৃষ্টি হারানো তরুণ কিংবা কৃত্রিম পা লাগানোর অপেক্ষায় থাকা গ্রামীণ কিশোরকে সনদের খোঁজে টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরতে হয়; তা কেবল প্রশাসনিক স্থবিরতা নয়, বরং চরম মানবিক অবমাননার নামান্তর। সাহায্যের আশায় রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন দপ্তরে বারবার যাতায়াত করেও ব্যর্থ মনোরথ হয়ে শূন্য হাতে ফিরে যাওয়ার ঘটনাগুলো বিপ্লবের চেতনাকেই উপহাস করে চলেছে।
—পুনর্বাসন ও সহায়তার মূল দায়িত্বে নিয়োজিত ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটের মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যেকোনো বড় রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র কিংবা বিশ্বব্যাংক যেভাবে বৃহৎ তহবিল গঠন করে, বাংলাদেশে সেই ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কূটনীতি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী দেখা যায়— ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন তাদের অফিশিয়াল সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেছে যে, তারা নীতিমালার অধীনে মোট ৮২৯টি শহীদ পরিবারকে (৪১ কোটি ২৭ লাখ টাকা) এবং ৬,৪৭১ জন আহত জুলাই যোদ্ধাকে (৭৪ কোটি ২১ লাখ টাকা) আর্থিক সহায়তার আওতায় আনতে পেরেছে।
—জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশন (OHCHR) এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বাস্থ্য উপকমিটির প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী মোট শহীদের সংখ্যা ১,৪০০ থেকে ১,৬০০ জনের মধ্যে এবং আহতের সংখ্যা ২২ থেকে ২৪ হাজারের অধিক ধরা হয়। তবে সরকারি গেজেট ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক এমআইএস (MIS) তালিকায় প্রাথমিকভাবে নিবন্ধিত ও স্বীকৃত সংখ্যার সাথে এই মোট হিসাবের কিছুটা প্রশাসনিক তারতম্য রয়েছে।
—সংখ্যার সঠিক তারতম্য সংকটও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে। দুই বছরেও কেন এই সংখ্যার সঠিকতা নিরূপণ করা গেল না বা হল না? সঠিক ডাটাবেজ এবং মাঠ পর্যায়ের নির্ভূল তথ্য জাতির সামনে উপস্থিাপন করতে না পারার অর্থ হলো ইতিহাসকে পেরেকমারা প্রশ্নের সুম্মুখীন করা। সকল আহতদের চিকিৎসা করতেই ব্যর্থ, তার উপরে জুলাই যোদ্ধা আহত কত, শহীদ কত? এই সংখ্যা নিয়ে যত দিন যাবে বিভ্রম বাড়তে থাকবে এবং একদিন ইতিহাসের কাছে দায়িত্বরতরা দায়ী হয়ে থাকবে , তাতে কোন সন্দেহ নেই। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। সে একদিন সকলকেই সত্যের সামনে দাঁড় করাবে।
—তারপরও আমরা যদি ধরে নেই, মোট ১,৬০০-এর বেশি শহীদ পরিবারের মধ্যে; এ পর্যন্ত মাত্র ৮২৯টি পরিবারকে এককালীন আর্থিক অনুদান বা ভাতার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এখনও, বৃহৎ একটি অংশ আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় এখনও বঞ্চিত। প্রায় ২৪ হাজার (এই সংখ্যাও আপাত অনুমানের উপর ধরে নেয়া হলো) আহতের মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র ৬,৪৭১ জন আহত জুলাই যোদ্ধাকে ক্যাটাগরি ভিত্তিক আর্থিক সহায়তা ও চিকিৎসা সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এখনও ১৭,০০০ জনেরও বেশি আহত বীর যোদ্ধা কোনো ধরনের স্থায়ী রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা, পুনর্বাসন বা মাসিক ভাতার সুবিধা পাননি।
—দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয়, ওষুধ, অপারেশন এবং এককালীন অনুদান দিতে গিয়ে ফাউন্ডেশনের নিজস্ব তহবিল প্রায় নিঃশেষিত। অর্থ সংকটের কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পর্যন্ত বকেয়া পড়েছে। যে প্রতিষ্ঠানের ওপর হাজার হাজার পরিবারের ভাগ্য ও জীবন-মরণ আজ নির্ভরশীল, তার এই প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক পক্ষাঘাত সামগ্রিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে চরমভাবে মন্থর করেছে। ফলে ওষুধের দোকানে বকেয়া ও যন্ত্রণার আর্তনাদ আজ একই বিন্দুতে এসে মিশেছে।
—ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাবিধুর এবং স্পর্শকাতর দিক হলো অনুদান বণ্টনকে কেন্দ্র করে শহীদ পরিবারের অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি লড়াই। বহু তরুণ শহীদের ক্ষেত্রে তাঁর সদ্য বিবাহিতা বিধবা স্ত্রী এবং বৃদ্ধ পিতা-মাতার মধ্যে এককালীন ৩০ লক্ষ টাকা ও মাসিক ভাতার মালিকানা নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক এবং আইনি বিরোধ তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্র যথাসময়ে একটি দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট বণ্টন নীতিমালা (যেমন—স্ত্রী, সন্তান ও পিতা-মাতার মধ্যে সুনির্দিষ্ট আনুপাতিক ভাগ) আইনি কাঠামোর মাধ্যমে কার্যকর করতে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করেছে। ফলে ‘সাকসেশন সার্টিফিকেট’ বা আদালতের উত্তরাধিকার সনদের জটিলতায় আটকে গেছে অসংখ্য অসহায় মায়ের চোখের জল। যে মা তাঁর সন্তানকে হারিয়েছেন এবং যে তরুণী তাঁর জীবনের আলো হারিয়েছেন, তাঁদের আজ মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রের এই নীতিগত মন্থরতা।
—মানবিক এই সংকটকে আরও জটিল ও বিষাক্ত করে তুলেছে সমাজের একটি সুবিধাবাদী শ্রেণীর অনৈতিক লোভ। প্রকৃত শহীদ ও আহতদের আড়ালে ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট, এক্স-রে রিপোর্ট এবং ভুয়া জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে প্রায় ৫০টিরও বেশি প্রতারক চক্র অনুদান হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করার সময় ধরা পড়েছে। এই নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে কর্তৃপক্ষ প্রতিটি আবেদন অত্যন্ত কড়াকড়ি এবং ধীরগতিতে মাঠপর্যায়ে যাচাই করতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু এই যান্ত্রিক যাচাই প্রক্রিয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে হাসপাতালের শয্যায় পচন ধরা প্রকৃত বিপ্লবীদের। জালিয়াতি রুখতে গিয়ে যে সময় নষ্ট হচ্ছে, তার মাশুল দিচ্ছে প্রকৃত আহতদের পঙ্গুত্ব ও অবর্ণনীয় শারীরিক কষ্ট।
—১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুদায়িত্ব পালন করাকালীন সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক মনোযোগের একটি বড় অংশ চলে যায় নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের রাজনৈতিক সমীকরণে। পরবর্তীতে নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দুই মাসে প্রশাসনিকভাবে গুছিয়ে ওঠার মন্থরতায় পুনর্বাসন প্রক্রিয়াটি গতি হারিয়ে ফেলে।
—উপরন্তু, অতীতে রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় সংশ্লেষের ভিত্তিতে তালিকাভুক্তকরণে কিছু বৈষম্যের অভিযোগ ওঠায় পুরো ডাটাবেজটিকে নতুন করে বিন্যাস করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এই রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল এবং প্রাতিষ্ঠানিক মনোযোগের বিচ্যুতি সময়কে আরও দীর্ঘায়িত করেছে, ফলে মাঠপর্যায়ে সাহায্য পৌঁছানোর কাজ স্থবির হয়ে পড়েছে।
—বিশ্বের যেকোনো সফল বিপ্লবের পর সম্মুখসারির যোদ্ধাদের যদি প্রথাগত ফাইলের নিচে ফেলে রাখা হয়, তবে সেই রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে তার নৈতিক বৈধতা ও আত্মিক শক্তি হারায়। জুলাইয়ের শহীদ পরিবার ও আহতদের পাশে দাঁড়ানো কোনো দয়া কিংবা দাতব্য কাজ নয়—এ হলো, এই গণপ্রজাতন্ত্রের অস্তিত্বের ঋণ। কেন দুইবছর পরও থামেনি জুলাইয়ের আর্তনাদ?
—২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের বীর সৈনিকদের প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় সম্মান, সামাজিক স্বীকৃতি এবং আইনি মর্যাদা অবিলম্বে প্রদান করা রাষ্ট্রের পরম কর্তব্য। যারা বুক পেতে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছেন, তাঁদের আজ হাসপাতালের বারান্দায় কিংবা দপ্তরের টেবিলে অবহেলার শিকার হওয়া চরম জাতীয় লজ্জার বহিঃপ্রকাশ।
—বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে সব ধরনের রাজনৈতিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে, আন্তর্জাতিক দাতা গোষ্ঠী, করপোরেট সেক্টর ও জাতীয় খাতের সমন্বয়ে একটি বিশেষ ‘জরুরি স্বাধীন তহবিল’ গঠন করে নৈতিকভাবে এসকল পরিস্থিতি মোকাবেলা করা বলে উচিত। আমলাতান্ত্রিক ফিতার দেওয়াল ভেঙে প্রতিটি প্রকৃত ভুক্তভোগীর দোরগোড়ায় আজীবন চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের আইনি অধিকার পৌঁছে দেওয়াই হবে জুলাইয়ের রক্তের প্রতি প্রকৃত মানবিক বিচার। তা না হলে,ক্ষমতার চির আনন্দে এবং নতুন দিনের কোলাহলে জুলাইয়ের এই আর্তনাদ অন্তহীন দীর্ঘশ্বাস হয়ে ইতিহাসের পাতায় থেকে যাবে!
লিটন আব্বাস: নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক