তামাকজাত দ্রব্যের আইন বিরোধী প্রচারণা ও নতুন নিকোটিন পণ্যের আকর্ষণীয় প্রলোভনের ফাঁদ পেতে কিশোর-তরুণদের নেশার জালে জড়াচ্ছে তামাক কোম্পানিগুলো। জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যত প্রজন্মের সুরক্ষায় বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বাস্তবায়ন এবং নতুন আইন করে ই-সিগারেট, ভেপ, নিকোটিন পাউচ নিষিদ্ধে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।
রবিবার (২৪ মে), সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘মানস’ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এ আহ্বান জানান। সংবাদ সম্মেলনে মুল প্রবন্ধ উপস্থাপন ও সভাপতিত্ব করেন ‘মানস’ এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী। এতে অতিথি আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মানস এর সহ-সভাপতি এবং অভিনেত্রী রুমানা রশীদ ঈশিতা, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম, ইউনিকো হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আদ্রা কুরিয়েন, মানস এর সাংগঠনিক সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান তালুকদার। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মানস এর সাধারণ সম্পাদক ও কন্ঠশিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদ ও সঞ্চালনা করেন মানসের সিনিয়র প্রজেক্ট এন্ড কমিউনিকেশন অফিসার মো. আবু রায়হান।
মূল প্রবন্ধে মানস সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী বলেন, দেশে তামাক উৎপাদন এবং ব্যবহারজনিত কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতি হয় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। তামাক খাত প্রাপ্ত রাজস্ব আসে ৪১ হাজার কোটি। ক্ষতি দ্বিগুণেরও বেশি। এমন অবস্থায় তামাক কোম্পানিগুলো শিশু-কিশোরদের তামাকপণ্যে আকৃষ্ট করতে রং, ফ্লেভার, আকর্ষণীয় ডিজাইনের মাধ্যমে প্রলোভনের ফাঁদে ফেলছে। ই-সিগারেট বিশ্বের ৪৬ দেশে নিষিদ্ধ, ৮২ দেশে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। অথচ, বাংলাদেশে ই-সিগারেট, ভেপ, নিকোটিন পাউচসহ ইমার্জিং তামাক পণ্যে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। আমরা উল্টো পথে হাঁটছি। উপরন্তু, অনলাইন পোর্টাল, সোস্যাল মিডিয়া এবং নাটক, চলচ্চিত্র, ওয়েবসিরিজে প্রধান চরিত্রগুলো দ্বারা ধূমপান, ই-সিগারেট, মাদকদ্রব্য সেবনের দৃশ্য ফোকাস করে প্রচার করা হচ্ছে। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা লঙ্ঘণ করে এসব প্রচারণা কিশোর-তরুণ ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে বিপদে ফেলছে। তামাক কোম্পানিগুলোর অপকৌশল প্রতিরোধ ও তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
রুমানা রশীদ ঈশিতা বলেন, তামাকের সাথে আইন ও নীতি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয় জড়িত। তবে তামাকের বিরুদ্ধে সচেতনতা সবচাইতে কার্যকর পদ্ধতি। যাদের কথা মানুষ শুনে এবং যারা তরুণদের নেশামুক্ত সুস্থ জীবনে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন, তাদেরকে তামাক বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
আদ্রা কুরিয়েন বলেন, রোগের চিকিৎসার চাইতে প্রতিরোধে জোর দিতে হবে। তামাক কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রন করা গেলে প্রতিরোধযোগ্য রোগ ও মৃত্যু কমে আসবে। এজন্য সচেতনতার বিকল্প নেই। মানুষ সচেতন হলে তামাকের ব্যবহার ও ক্ষতি কমে আসবে। তামাক নিয়ন্ত্রণে ইউনিকো হাসপাতাল সার্বিক সহযোগিতা করবে বলে জানান তিনি।
সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, রোগের চিকিৎসার জন্য মানুষকে নিজ পকেট থেকে ৮০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। দেশে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের রোড়, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসক্রামক রোগ, যার মূলে রয়েছে তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার। এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে সিগারেট কোম্পনিগুলো নতুন আর্টিফেসিয়াল নিকোটিন পণ্য বাজারে আনছে। যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি! তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পাস করায় বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আরো বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে- ইমার্জিং তামাক পণ্য বাদ পড়েছে। ই-সিগারেট আমদানীতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তবে ছড়িয়ে পড়ার আগেই পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে পৃথিবীর সবচাইতে স্বল্পমূল্যে তামাক পণ্য পাওয়া যায়। একটি ডিম ১০ টাকার বেশি সেখানে এখন ৫টাকায় জর্দা, গুল, সিগারেট পাওয়া যায়। তামাক পণ্যে উচ্চ কর মূল্য বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্লেলন থেকে ই-সিগারেট ও নতুন তামাক পণ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা, নাটক ও চলচ্চিত্রসহ সকল বিনোদন মাধ্যমে ধূমপানের দৃশ্য বন্ধে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন এবং ওটিটি নীতিমালা পাস করা, অনলাইন ও সোস্যাল মিডিয়ায় তামাকপণ্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা বন্ধ করা এবং কোম্পানিগুলোকে শাস্তির আওতায় আনা, তামাক পণ্যে উচ্চ কর ও মূল্য বৃদ্ধি করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতা কার্যক্রম বৃদ্ধি করা, তামাক চাষের বিকল্প চাষাবাদে কৃষকদের উৎসাহিত করা, তামাক কোম্পানিতে সরকারের অংশীদারিত্ব প্রত্যাহার, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি গ্রহণ এবং তামাক বিরোধী জনসচেতনতায় গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা পালনের সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
উল্লেখ্য, বিশ্বে প্রতিবছর ৮৭ লক্ষাধিক মানুষ মারা যায় তামাকের কারণে। দেশে বছরে ১ লক্ষ ৯৯ হাজারের বেশি মানুষ তামাকজনিক রোগে মারা যায়। তামাকের ক্ষয়-ক্ষতি প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৮৮ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী ৩১ মে দিনটিকে ‘বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘Unmasking the Appeal: Countering Nicotine & Tobacco Addiction । যার বাংলা ভাবানুবাদ “প্রলোভনের মুখোশ উন্মোচন করি, তামাক ও নিকোটিনের আসক্তি প্রতিরোধ করি।”