বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস ২০২৬ উদ্যাপন উপলক্ষ্যে ‘দক্ষতায় গড়ি সম্মিলিত ভবিষ্যৎ’ (Skills for a Shared Future) প্রতিপাদ্যকে সামনে নিয়ে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ)-এর উদ্যোগে বর্ণাঢ্য র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ ২৮ জুলাই, ২০২৬ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বিনিয়োগ ভবনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) জনাব রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব মো: নুরুল হক, এমপি; প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব জনাব এ বি এম আব্দুস সাত্তার এবং জাতীয় মানব সম্পদ উন্নয়ন তহবিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও জনাব মো: তৌহিদুর রহমান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সচিব ও জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। র্যালিতে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তর/ সংস্থার প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী ও এনজিও প্রতিনিধি, দক্ষতা উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাতের প্রতিনিধি, অ্যাসেসর, প্রশিক্ষক, প্রশিক্ষণার্থী, তরুণ ও যুবসমাজসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ করেন।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা জনাব রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা ও উন্নয়নের জন্য দক্ষ, উৎপাদনশীল ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী মানবসম্পদ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা যুবকদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কারিকুলাম যুগোপযোগী করার পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার অন্বেষণ করতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যোগ্যতা ও দক্ষতার সনদ প্রদানের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন শ্রমবাজারে পাঠানোর উদ্যোগ জোরদার করতে হবে এবং পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী রিস্কিলিং ও আপস্কিলিংয়ের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আনুষ্ঠানিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং দেশের অবশিষ্ট জনমিতিক লভ্যাংশের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, বর্তমান সরকার শিল্প ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে ইনভেস্ট বাংলাদেশ নামে একটি নতুন উন্নয়ন মডেল নিয়ে কাজ করছে। বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতির ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, লালফিতার দৌরাত্ম্য দূর করা, অর্থের সংস্থান, জ্বালানি নিরাপত্তা, মাল্টিমোডাল ও সিমলেস কানেক্টিভিটি এবং উৎপাদনশীল ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ২০২৪- পরবর্তী সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে সরকার বয়ানের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অল্প সময়ের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়াবে এবং একটি ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হয়ে টেকসই সমৃদ্ধি, শান্তি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব নুরুল হক বলেন, বর্তমান সরকার স্বল্প ব্যয়ে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি বিদেশে পাঠাতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো কার্যকরভাবে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি দক্ষতা উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসার পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, কাতার সরকার বাংলাদেশে চারটি সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে তাদের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী উপযোগী করে দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। ইউরোপে সম্ভাবনাময় নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ কাজে লাগাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসন বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নেবে। প্রথাগত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিকল্প ও উদ্ভাবনী উপায়ে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সম্প্রসারণে তিনি এনএসডিএ-এর কার্যকর ভূমিকা প্রত্যাশা করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জনাব এ বি এম আব্দুস সাত্তার বলেন, দেশে দুর্নীতি ও লালফিতার দৌরাত্ম্য এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি। এসব বিষয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিবেচনায় রয়েছে এবং তা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দক্ষতা উন্নয়নে যেসব প্রতিষ্ঠান কার্যকর ও সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করবে, সরকার তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দক্ষতা উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন। তাঁর নির্দেশনায় ইতোমধ্যে ঢাকায় এআইভিত্তিক ট্রাফিক সিগন্যাল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়নের ওপর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন এবং দক্ষতা উন্নয়নকে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তাঁর পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সরকারের সচিব ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী বলেন, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংস্থা ও বেসরকারি খাতে দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যে এনএসডিএ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছে এনএসডিএ। সরকারি-বেসরকারি খাতের চাহিদার ভিত্তিতে টাস্ক অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে দক্ষতার মান ও কারিকুলাম উন্নয়ন, পুরোনো স্ট্যান্ডার্ড ও কারিকুলাম পর্যালোচনা এবং নতুন ও উদীয়মান অকুপেশনের জন্য স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রশিক্ষক ও অ্যাসেসরদের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সেক্টরভিত্তিক চাহিদা ও সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। শিল্প দক্ষতা পরিষদগুলোকে (আইএসসি) আরও কার্যকর ও সক্ষম করে তুলতে প্রায় ১ কোটি টাকার অফিস সরঞ্জাম প্রদান করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনায় জাপানিজ, ইংরেজি, আরবি ও ইতালিয়ানসহ বিভিন্ন বিদেশি ভাষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কারিকুলাম উন্নয়নের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজার উপযোগী স্ট্যান্ডার্ড ও কারিকুলাম প্রণয়ন করা হচ্ছে। এনএসডিএর নিবন্ধিত ৭৮৭টি দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের জব ও শিল্প সংযোগ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, জাতীয় দক্ষতা সনদ (এনএসসি) অর্জনকারীদের ৭৪ শতাংশ কর্মসংস্থান বা আত্মকর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন এবং ৮.৩ শতাংশ ৭২টি দেশে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কর্মসংস্থান লাভ করেছেন। নিষ্ক্রিয় দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এনএসডিএর জাতীয় দক্ষতা সনদের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রদত্ত অন্যান্য সনদ ও সার্টিফিকেশন কার্যক্রমকে সমন্বয়ের মাধ্যমে এনএসডিএর আওতায় অ্যাসেসমেন্টের ভিত্তিতে জাতীয় দক্ষতা সনদ প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। এছাড়া এনএসডিএ সনদধারীদের একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেমের আওতায় আনার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের চাহিদা মোকাবিলায় তরুণদের ভবিষ্যৎ উপযোগী দক্ষতা অর্জনের কোনো বিকল্প নেই। ডিজিটাল রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, সবুজ অর্থনীতি এবং শিল্পখাতের পরিবর্তনশীল চাহিদার কারণে কর্মজগতের দক্ষতার ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ বাস্তবতায় তরুণদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা, অভিযোজন সক্ষমতা, উদ্ভাবনী চিন্তা ও আজীবন শেখার মানসিকতা অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা আরও বলেন, দেশের বিপুল যুব জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে সরকার দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষতা প্রশিক্ষণ, জাতীয় দক্ষতা মানদণ্ড প্রণয়ন, প্রশিক্ষণের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ, দক্ষতার স্বীকৃতি প্রদান এবং দক্ষ যুবকদের দেশ-বিদেশের শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি খাত, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ প্রদানকারী সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কার্যকর অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি দক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভবিষ্যৎ উপযোগী কর্মশক্তি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস প্রতি বছর ১৫ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। তরুণদের কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও টেকসই জীবিকার জন্য দক্ষতা অর্জনের গুরুত্ব তুলে ধরতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০১৪ সালে দিবসটি ঘোষণা করে। একই সঙ্গে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের গুরুত্ব এবং বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডায় এর ভূমিকা আরও সুদৃঢ় করাও দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য। বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস ২০২৬ উপলক্ষ্যে ১৫ জুলাই তারিখে মিডিয়া ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে এনএসডিএ দিবসটি উদ্যাপন শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২৮ জুলাই র্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে দেশের যুবসমাজকে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে এবং দক্ষ, কর্মক্ষম, উদ্ভাবনী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সকল অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তর/ সংস্থার প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী ও এনজিও প্রতিনিধি, দক্ষতা উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাতের প্রতিনিধি, অ্যাসেসর, প্রশিক্ষক, প্রশিক্ষণার্থী, তরুণ ও যুব প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।