মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ২৭Dedicate To Right News
Shadow

ভ্রমণ কাহিনী: নিয়ম মানার দেশে

Spread the love
  • দিনু প্রামানিক

=এক=

অফিসের কর্মব্যস্ততায় বেশ হাফিয়ে উঠছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে বাচ্চা’কে স্কুল নেয়া। তারপর ফ্রেস হতে হতেই অফিসের গাড়ী এসে হাজির। নাস্তা খেয়ে তাড়াহুড়ো করে গাড়ীতে উঠা। অফিসে এক নাগাড়ে কাজ করতে করতে রাত আটটা- নয়টা। জীবন তো নয় যেনো এক যন্ত্রে পরিণত হয়ে গেছি। দু’একদিন ছুটি নিব তারও কোন সুযোগ নাই। এমন কাট- খট্টা সময়গুলি নিয়েই চলছিল জীবন।

সেদিন সকালও শুরু হলো এমন কাট- খট্টা’র মধ্যে দিয়ে। সামনে এক খাতক গ্রাহক নিয়ে কঠোরতম মিটিং করছি। মেজাজটা ভিতর ভিতর চরম খিটখিটে হয়ে আছে। কিন্তু, মুখে কি সুন্দর হাসির লেশ ছড়িয়ে যাচ্ছি। এমন সময় ম্যানেজিং ডিরেক্টর মহোদয়ের একান্ত সচিব ফোনে কুশল বিনিময় করে বলল, স্যার আপনার সাথে কথা বলবেন। লাইনে থাকেন। কাঁপা গলায় স্যার’কে সালাম দিতেই তিনিও কুশল বিনিময় করে বললেন, আপনার পাসপোর্ট করা আছে কিনা!!

– জ্বী, স্যার। পাসপোর্ট করা আছে।
– আপনার জন্য একটা সুখবর।
– প্লিজ, স্যার!
– দুবাই’তে আপনাকে একটা প্রোগামে নমিনেশন দিলাম। তিনদিনের প্রোগামের সাথে আরো দু’দিন ছুটি নিয়ে ভালভাবে ঘুরে আসবেন।

ঘন্টা খানেক পর মানব সম্পদ বিভাগ থেকে অভিনন্দন জানিয়ে ফোন। আনন্দ আর ঘোরের মধ্যেই কাটল সমস্তদিন। আনন্দে সারারাত ঠিকমতন ঘুমাতে পারিনি। জীবনের প্রথম এক্স-কান্ঠ্রি ভিজিট। নমিনেশন চিঠি আসল ই-মেইলে। অফিসের সবাই জানতে পারল। অভিনন্দন, মেসেজ আর ফোন। সাথে সাথে পেইজে একটা স্ট্যাটাস দিলাম-
‘ডাকছ তুমি হাতছানিতে, আসব আমি ঊড়ে।
মনের মধ্যে আকুম বাকুম, কেমন কেমন করে।‘
আমার সাথে ছিল আমাদের কোম্পানী সচিব মহোদয় জনাব হাসান ইমাম। কাজেই ভিসা জটিলতা এবং এয়ারটিকেটসহ যাবতীয় ঝামেলার কাজগুলি বিনয়ের সাথে সচিব মহোদয়’কে সম্পন্ন করে দেয়ার জন্য অনুরোধ করলাম। স্যার অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ। সময়ে সময়ে ফোনালাপনের মাধ্যমে আমার সবগুলি কাজ সম্পন্ন করে দিলেন। যেহেতু এটাই ছিল আমার প্রথম বিদেশ ভ্রমণ তাই স্যার আমাকে কিছু টিপস দিলেন। যথাসময়ে বিমানের টিকিট ও আরব আমিরাতের ভিসা হাতে পেয়ে গেলাম।

কুয়েত এয়ারলাইনস ১২ ই নভেম্বর রাত তিনটায় ফ্লাইট। প্রতিদিনের মতন আগেরদিন অফিস করলাম। দুপুর বারোটায় অফিস থেকে বের হয়ে বাসা থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে রহমতপুর এয়ারপোর্ট পৌঁছুলাম। ইউএস বাংলা বিমানে টাইম সিডিঊল ছিল ১২.৫৫ মিনিট। আমিই ছিলাম শেষ যাত্রী। আধাঘন্টার মধ্যেই শাহজালাল আন্তজার্তিক বিমানবন্দরে নামলাম। বিমানবন্দর থেকে ট্যাক্সি করে উত্তরা বন্ধু আসাদ এর অফিসে গেলাম। বন্ধু আসাদ আমার সাথে দুপুরের লাঞ্চ করবে তাই অপেক্ষা করছিল। লাঞ্চ শেষ করে রেস্ট করার আগেই হাজির বন্ধু মনজিত। দীর্ঘ এগার বছর পর মনজিতের সাথে দেখা। বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলাম। শুধু দু’জন দু’জনকেই বললাম, বলতে পারবি- কতদিন পর তোর সাথে দেখা। মনজিত জোর করে ওর বাসায় নিয়ে গেল। বৌদি খুব যত্ম করে নিজের হাতে রান্না করছে। এই এগার বছরে আমাদের অনেক পরির্বতন হয়েছে। দু’জনারই সংসার হয়েছে। কিন্তু মনের মিলের একটুও পরির্বতন হয়নি। ওর বাসা থেকে বের হয়ে রাত দশটা পর্যন্ত আমরা বাইরে ঘুরলাম। রুমে ফিরতেই বন্ধু আসাদ বকা দিয়ে বলল, তোর ফ্লাইট কি আজ না কাল? ফ্লাইট সিডিউল আজ রাত তিনটায় বলতেই ও আরো রেগে গেল। বলে, তুই আজ একটু রেস্ট নিবি না। সত্যিইতো, আজ আমার দীর্ঘ জার্নি। একটু রেস্ট নেয়া হয়ত ভাল ছিল।

=দুই=

সচিব মহোদয় রাত নয়টা পর্যন্ত বোর্ড মিটিং শেষ করে সোজা এয়ারপোর্টের দিকে রওনা করছেন। আমিও সোয়া এগারটা মধ্যে এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেলাম। এয়ারপোর্টে পৌঁছামাত্রই আমাদের কুয়েত এয়ারলাইনস্ এর সিডিউল ঠিক আছে দেখে মনটা খুশিতে ভরে উঠল। বোর্ডিং পাশের র্দীঘ লাইন দেখে আমি বোর্ডিং পাশ ইনচার্জ ম্যাডামের সহায়তা চাইলাম। তিনি আমাকে একটু অপেক্ষা করতে বললেন। বাংলাদেশীদের জন্য দুবাই ভিসা বন্ধ। অতএব ভিসা পরীক্ষা না করে বোর্ডিং পাশ দেয়া যাবেনা। আমি সচিব মহোদয় জনাব হাসান ইমাম স্যারের জন্য অপেক্ষা করতে বলি, যেনো আমাদের দু’জনের ভিসা একসাথে পরীক্ষা করা হয়। ইতিমধ্যে স্যার আসলেন ক্লান্ত চোখে, মুখে মিষ্ঠি হাসি। বোর্ডিং পাশ ইনচার্জকে স্যারের কথা বলতেই তিনি সদা- হাসি মুখে দাঁড়িয়ে সচিব স্যারকে সালাম দিলেন। পাসপোর্ট ও ভিসার কপি হাতে নিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের ভিসা চেক ও বোর্ডিং পাশ হয়ে গেল। বোর্ডিং পাশ পেয়ে আমরা ইমিগ্রেশন অফিসারের কাছে গেলাম। আমাদের দেশের শ্রমিকদের ইমিগ্রেশন করতে করতে ইমিগ্রেশন অফিসার সবার সাথেই শ্রমিকদের মতই ব্যবহার করেন। যে শ্রমিকের কষ্ঠে অর্জিত বিদেশী রেমিটেন্স এদেশে আসে সেই শ্রমিক কত অবহেলিত তা আমি আমার দেশের ইমিগ্রেশন অফিসারের ব্যবহারে বুঝতে পারি। অথচঃ এই ইমিগ্রেশন অফিসারগণের উচিত এসব রেমিটেন্স যোদ্ধাদের সাথে ভাল ব্যবহার করা। যখন তিনি আমার ব্যাংকের এনওসি দেখল সেই ইমিগ্রেশন অফিসার তার ব্যবহার সম্পূর্ণ ঊল্টে ফেলল। হাসি মুখে আমাকে ভিতরে প্রবেশ করার অনুমতি দিল। তখন রাত একটা। আমরা ক্রেডিট কার্ডে বুথ থেকে ডলার ইনড্রোসমেন্ট করে ভিআইপি লাউন্সে ঢুকে রেস্ট নিলাম।

ঘন্টা খানেক বাদে কুয়েত এয়ারলাইন্স যাত্রীদের ডাকা হলো। আমাদের বোর্ডিং পাশ চেক করে বিমানে ঢুকানো হল। সবাই কি সুন্দর লাইন মেনে এক এক করে বিমানের ভিতরে প্রবেশ করল। আও!!! কি সুন্দর বিমানের ভিতরের পরিবেশ। বিমানে প্রবেশ করতেই বিমানবালা সুন্দরী তরুণী হাসি মুখে আমাদের’কে অভিবাদন জানিয়ে সিট দেখিয়ে দিল। আমরা সিট বেল্ট বেঁধে নিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের বিমান আকাশে ঊড়াল দিল। বিশ মিনিটের মধ্যেই বিমান বাংলাদেশের সীমানা ক্রস করল। সামনের স্কীনে আমরা প্রত্যেকটা স্টেপের আপডেট দেখতে পাচ্ছিলাম। বিমান কোন পয়েন্টে, কত ঊঁচুতে, বিমানের গতিবেগ, বাইরে তাপমাত্রা, বাতাসের আদ্রতা- গতিবেগ সব। এখান থেকেই শুরু হলো আমার নিয়ম মেনে চলার দেশে পর্দাপণ। যেহেতু এটাই আমার জীবনের প্রথম বিদেশ যাত্রা। তাই আমি প্রত্যেকটি বিষয়ের প্রতি ছিলাম অতি ঊতসাহী।

=তিন=

টানা সাড়ে ছয় ঘন্টা যাত্রা শেষে আমরা ভোর সাড়ে ছয়টায় কুয়েত এয়ারপোর্ট ল্যান্ড করলাম। কুয়েত এয়ারপোর্ট থেকে মোবাইল ক্যামেরায় ঝটপট কয়েকটা ছবি তুলে ফেললাম। ঊল্লেখ থাকে, এখানে আমাদের ফ্লাইট সিডিউল ছিল তিনঘন্টা পর। বিমান থেকে নামিয়ে আমাদের’কে আবার চেক পোষ্টে নেয়া হলো। নিজের কাছে খুব খারাপ লাগল, চেকিং এ যখন পায়ের জুতা খুলতে বলা হলো। যদিও আমার শরীরে হাত দিয়ে কখনও চেকিং করেনি তথাপি খারাপ লাগল যখন আমার পাশ দিয়ে এক বাঙ্গালী তরুণী প্যারিস যাত্রী বলতে বলতে যাচ্ছে, চেকিং এর নামে শরীরের এমন সব জায়গায় হাত দেয় তা ভাবতে নিজের কাছেই লজ্জা লাগে। কুয়েত এয়ারপোর্টটা বেশ বড়, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। কোথাও ছিঁটে- ফাঁটা কোন ময়লা নেই। সবাই ওয়েষ্টবিনে ময়লাগুলি নিজ নিজ দ্বায়িত্বে ফেলছে। আমরা বিমানবন্দরের ফর্মালিটিস সর্ম্পূণ করার পর ভিআইপি লাউন্জে গিয়ে ফ্রেস হলাম। সকালের জন্য হালকা নাস্তা করে পরবর্তী বিমানের সিডিউল পযর্ন্ত রেস্ট নিলাম।

সময়মতন দুবাই যাত্রীদের’কে বোর্ডিং পাশের জন্য ঘোষণা এলো। আমরাও সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে গেলাম। একে একে বোর্ডিং পাশ চেক করে আমরা বিমানে ঊঠলাম। সিট বেল্ট বেঁধে আমাদের ফ্লাইট আকাশে উড়তে লাগল। ততক্ষণে আমাদের বেশ ক্ষুধা লেগে গেল। বিমানের হালকা নাশতায় তা আপাততঃ কিছুটা নিবারণ হলো। দুপুর নাগাদ আমরা দুবাই এয়ারপোর্টে সীমানায় পৌঁছুলাম। বিমানের জানালা দিয়ে নিচে দেখতে লাগলাম। বালু আর গুল্মজাতীয় ছোট ছোট গাছ দেখা যাচ্ছিল। বিশাল বড় এয়ারপোর্ট। এটাই কি বিশ্বের সবচেয়ে বড় এয়ারপোর্ট! আমাদের বিমান খুব সহজভাবেই ল্যান্ড করল। আমরা যথারীতি বিমান থেকে নেমে সিঁড়িবেয়ে এয়ারপোর্টের দোতলা উঠতেই ট্রেন বা বাস জাতীয় আমাদের সামনে এসে দরজা খুলে গেল। আমরা ভিতরে ঢুকলাম। জানতে পারলাম, এটা মেট্রোরেল। দুবাই এয়ারপোর্ট থেকে বের হতে হলে মেট্রোরেলের মাধ্যমে আসতে হয়। এখানে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার কার্যক্রম সম্পূর্ণ করার পর আমরা র‍্যাগেজ হাতে নিয়ে কোথায় কিভাবে যাব তা বুঝতে পারছিলাম না। বাইরে এসে দেখি, নামের সাইনবোর্ড হাতে আমাদের জন্য ওয়েটার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। আমরা নিজেদের পরিচয় দিয়ে গাড়ীতে উঠলাম। আমাদের দেশের গাড়ীর ড্রাইভিং সিট ডান দিকে কিন্তু দুবাইতে দেখলাম বাম দিকে। ড্রাইভার সাহেব খুব সর্তকভাবে গুগল অ্যাপসের লোকেশন ম্যাপ অনুযায়ী গাড়ী ড্রাইভ করে আমাদেরকে আল- ঘুরাইয়ায় নামক একটি পাঁচতারকা হোটেলে নিয়ে আসল। অভ্যর্থনায় অতিথি হিসেবে আমাদের’কে খেজুর দিয়ে অ্যাপায়ন করা হলো। সেখানে আমাদের জন্য রুমগুলি আগেই রির্জাভ ছিল। ফরমালিটিস কমপ্লিট করে আমাদের রুমগুলি বুঝিয়ে দেয়া হলো। আমরা রুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে আবার বের হলাম দুবাই এর রাস্তায়। তার পূর্বে গাইড আমাদের’কে সেদেশের নিয়ম কানুন কিছুটা বুঝিয়ে দিল। একটা বিষয়ে বড় অবাক লাগছিল, রোড ফাঁকা তবুও কেউ সিগনাল অমান্য করে রোড পার হচ্ছে না। আবার গাড়ীগুলিও কি সুন্দর সিগনাল মেনে সারিবদ্ধভাবে চলছে। বরং সবাই গ্রীন লাইট না জ্বলা পর্যন্ত সবাই দাঁড়িয়ে আছে। কেউ হুড়পাড় করে কোন রাস্তা পার হওয়াতো দূরের কথা, সবাই কি সুন্দর নিয়ম মেনে সুশৃঙ্খলভাবে চলাফেরা করছে। রাস্তাঘাট পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। কোথাও ছিঁটে- ফাঁটা কোন ময়লা নেই। সবাই ওয়েষ্টবিনে ময়লাগুলি নিজ নিজ দ্বায়িত্বে ফেলছে। এখানে অন্য প্রসঙ্গে দু’একটি কথা বলি। কর্মের খাতিরে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মিটিং, সেমিনার এ যেতে হয়। যে সব মিটিং- সেমিনার সাধারণত আমাদের দেশের বড় মাপের আমলারা প্রধান অতিথি থাকেন। আমি বাঙালি হিসেবে খুব কষ্ঠ পেতাম, যখন ঐসব আমলারা কথায় কথায় বিদেশের ঊদাহরণ দিত। আমি ডাল- ভাতে বাঙালী ওতসব বিদেশ বুঝি না। গ্রাম- বাংলার আবহাওয়ায় আমার বেড়ে উঠা, আমি আমার দেশকেই ভালবাসি।

=চার=

বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিরাশিজনের টিমে আমাদের দেশের ছিল বায়ান্নজন। আমাদেরকে বিভিন্ন প্রোগামের সিডিঊল দেয়া হলো। সন্ধ্যায় ছয়টায় দুবাই মেরিনাতে প্রোগাম। দুইটা বাস আসল আমাদের জন্য। সামনে জানালার ধারে সিটে বসলাম। কি সুন্দর রাতের দুবাই! আলোয় চকচক করছে বিশাল বিশাল আকাশছোঁয়া সব অট্টালিকা আর ফ্লাইওভার। দেখতে দেখতে আমরা মেরিনা বিচে পৌঁছে যায়। প্যাঁচানো `ক্যানন টাওয়ার` আকাশ বরাবর উঠে গেছে। তার পাশ দিয়ে আরো কয়েকটা সুউচ্চ লাল- নীল- সবুজ আলোর অট্টালিকা। আমরা সেখানে ছবি তুলতে ভুল করিনি। আমাদের জন্য আগে থেকেই সুসজ্জিত ট্র্যাভেল লঞ্চ রির্জাভ করা ছিল। আমরা লঞ্চে করে অনেক দূর পযর্ন্ত চলে গেলাম। লঞ্চের ছাদে বসে আমরা লেক আর অট্রালিকার চকচকে শহর বেশ উপভোগ করছি। একসময় নিরবতা ভেঙ্গে গানের সুর ভেসে আসতে লাগল। আমরা লঞ্চের ছাদ থেকে নেমে দ্বিতীয় তলার ডেকে চলে আসলাম। শুরু হয়েছে আরবী গানের মিউজিকের সাথে ডান্স। পরে জানতে পারছি এটা ছিল তনুরা ড্যান্স। গান, ডান্স আর রাতের বীচ আমরা খুব উপভোগ করলাম। লঞ্চেই আমাদের রাতের খাবার আয়োজন ছিল। আমাদের রাতের খাবার দেয়া হলো। রাত সাড়ে এগারটার পর আমরা হোটেলে ফিরে আসলাম।

পরদিন আমাদের টানা ফরমাল ড্রেসে অফিসিয়াল সেমিনার সেরে সন্ধ্যে সাড়ে ছয়টায় আবার প্রোগাম। বাসে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্পটগুলি দেখার পর শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ, বারবি কিউ ডেলাইটস- এ আসলাম। সামনে খেজুরগাছগুলি রঙ- বেরঙের সুজ্জিত আলোয় ঘেরা। সেখানে আমরা অনেকগুলি গ্রুপ ছবি, একক ছবি করলাম। ঝকঝকে চকচকে শহরে আমাদের কয়েকটা ছবি কাল আসল। এ শহরে আমরা হয়তঃ বড়ই বেমানান। রঙিন শহর ঘুরে রাতের খাবার খেয়ে আমরা বড় ক্লান্ত।

পরদিন সকাল আটটায় আমাদের প্রোগাম সিডিউল। আমরা সকালের নাস্তা করে রেডি হয়ে সময়মতন বের হলাম আবুধাবী’র উদ্দেশ্য। বাস চলছে, শহর পেরিয়ে মরুর প্রান্তরে। মরুভূমির মধ্য দিয়ে রাস্তা। যেতে হবে দীর্ঘ পথ। আমাদের গাইড দেয়া হয়েছে। গাইড আমাদের’কে আরব আমিরাত ইতিহাস তথা দুবাই, আবুধাবী, শারজার ইতিহাস ঐতিহ্য, ব্যবসা-কালচার সম্পর্কে ধারণা দেয়ার চেষ্ঠা করে যাচ্ছে। বাস থেকেই দু’পাশের অনেক ছবি তুলে নিলাম।

একসময় পৌঁছে গেলাম আরব আমিরাতের রাজধানী শহর আবুধাবিতে। দুপুর তখন ১২.৩০ মিনিট। মসজিদ থেকে আযান ভেসে আসছে। আমরা এখন আরব-আমিরাতের সবচেয়ে বড় মসজিদের সামনে। এ মসজিদ পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম ও সুন্দরতম। বাস থেকে নেমে ছবি তোলার লোভ সামলাতে পারলাম না। ঝটপট নিলাম কিছু ছবি তুলে। আমাদেরকে চেকিং করে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দিল। গাইড থেকে জানতে পারছি, সব ধর্মের মানুষ এখানে প্রবেশ করতে পারবে। তবে মহিলাদের অবশ্যই বোরখা পড়তে হবে সে যে ধর্মের হোক। সব মহিলা যখন বোরখা পড়ে ছিল, তখন সত্যিই খুব ভাল লাগছিল। মসজিদ প্রাঙ্গণে দর্শনার্থীদের ভিড়। মসজিদের নাম শেখ জায়েদ মসজিদ। মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে আরব আমিরাতের প্রয়াত রাষ্ট্র প্রধান শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাইয়ানের নামানুসারে।

আমরা ওযু করে জামাতের সাথে যহরের নামায পড়লাম। তারপর মসজিদটি চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ছবি তুললাম। মার্বেল পাথর, সোনা, আধা মূল্যবান পাথর, স্ফটিক ও মৃৎশিল্পের বিভিন্ন উপকরণে নির্মিত এ মসজিদটি। যতদূর জানতে পারছি, মসজিদের কার্পেট এর ওজন ৩৫ টন। নিউজিল্যান্ড এবং ইরানের উল থেকে তৈরি করতে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছিল। স্ফটিক স্বচ্ছ লক্ষ লক্ষ পাথরের তৈরি পৃথিবীর বৃহত্তম ঝাড় বাতিটি আছে এই মসজিদে। মসজিদের নির্মাণ করতে প্রায় বারো বছর সময় লেগেছিল। সাড়া বিশ্বের পর্যটকদের কাছেও এই মসজিদ অন্যতম জনপ্রিয়।

ততক্ষণে, আমাদের পেটে অনেক ক্ষুধা। মসজিদ থেকে আমাদের বাস মূল শহরের দিকে ছুটতে লাগল। কাউডইর্য়াড ম্যারিটো ওয়াল্ড ট্রেড সেন্টার, আবুধাবী’তে আমাদের বাস এসে থামল। এটাই আবুধাবীর সব্বোর্চ্চ অট্রালিকা। আমরা সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে আবুধাবীর লেক পাড় হয়ে আমাদের বাস ছুটতে ব্যস্ত মরু সাহারা দিকে। পথে যেতে আমরা সুশৃঙ্খল শহরের ঘোরানো পেঁচানো অট্রালিকাগুলি দেখছিলাম আর ছবি তুলছিলাম। সূর্য ডোবার আগ মুহুর্তে আমাদের বাস এসে থামল মরু সাফারী প্রান্তে। সেখান থেকে রিসোর্টে যেতে হবে বিশেষ জীপে করে। জীপে উঠে আমরা সবাই ভালোভাবে সিট বেল্ট বেঁধে নিলাম। অনেকগুলো গাড়ি লাইন ধরে বের হল যাতে মরুভূমিতে পথ হারিয়ে না ফেলে। পড়ন্ত বেলায় গাড়ি মরুভূমির বালির মধ্য দিয়ে দ্রুতগতিতে যাত্রা শুরু করল। কখনও গাড়ি বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে কখনও পাশ দিয়ে বিপজ্জনকভাবে চলছে। গাড়ি ধীরে চলার কোনো লক্ষণ নাই। মনে হতে লাগল এই বুঝি উল্টে পড়ে যাবে। অত্যন্ত দক্ষ ড্রাইভার গাড়িকে তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে চালাতে লাগল। অনেকটা রোলার কোস্টারের যাত্রীদের মতো অবস্থা আমাদের। এ এক ভিন্ন রকমের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। ডেজার্ট সাফারির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এটি। পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চড়ার অভিজ্ঞতা এখানে কাজে লাগে। বালির পাহাড়ের মধ্যে কখনও অনেক ওপরে কখনও পাশ দিয়ে কাত হয়ে কখনও পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে চলে প্রায় পনের মিনিট পর এক স্থানে এসে দাঁড়াল। সেখানে আমরা চারদিকে দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমিকে উপভোগ করলাম। তারপর রিসোর্টে পৌঁছে গেলাম। রিসোর্টটির চারপাশে বালির পাহাড়ের মাঝে খোলা প্রান্তরে অবস্থিত। মাঝে নাচ-গানের আসরের জায়গা। অনেকটা আমাদের দেশের গ্রামে যাত্রা পালার মঞ্চের মতন। পাশেই উটের পিঠে চড়ার ব্যবস্থা। সামনের উঠানে মরু ঐতিহ্যের ছেলেদের বেশ উপভোগ্য তনুরা, বেলী নৃত্য পরিবেশন শুরু হল। মরুভূমিতে আনন্দঘন সময় কাটিয়ে আমরা রাতের খাবার সেখানেই খেয়ে খানিকবাদে দুবাই ফেরার পথে যাত্রা শুরু করলাম। ডেজার্ট সাফারি এ এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

সে রাতে হোটেলে ফিরে আমরা আবার বের হলাম আল ঘুরাইয়া শপিং মলে। কি সুন্দর নিয়ম মতন চলছে। গেটে কোন দারোয়ান নাই। অটো গ্রাসডোর। শপিং শেষ করে সে রাতে দেড়টায় সময় আমরা হোটেলে ফিরলাম।

=পাঁচ=

পরদিন আমরা হোটেল ছেড়ে নতুন হোটেলে উঠলাম। আমাদের নতুন হোটেলের সামনে মেট্টোরেল ষ্টেশন। চলন্ত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলাম। স্টেশন ঘুরে ঘুরে দেখলাম। আমরা মেট্রোরেলের জন্য কার্ড কিনলাম। সেদিন দুপুরের পর দুবাই গোল্ড মার্কেট গেলাম। চোখ জুড়িয়ে যায় জগতখ্যাত শতশত গোল্ড মার্কেটের দোকান দেখে। আমরা কয়েকটা দোকান ঘুরে কিছু গোল্ড কিনে নিলাম।

পরদিন খুব ভোরে নাস্তা শেষ করে আমরা দু’জন বের হলাম। আল ফাহিদি মেট্টোরেল থেকে যাত্রা শুরু করে বুরজোমান ষ্টেশনে এসে রেড লাইন ট্রেন বদল করে সতেরটা ষ্টেশন পার হয়ে জুমাইরা লেক টাউন ষ্টেশনে নামলাম। উল্লেখ্য এখানে তিনটা লাইন একটা রেড লাইন, গ্রীন ও ইয়োলো। অনেকটা আমাদের দেশের রেল ক্রসিং এর মতন। আমাদের রেল ক্রসিং এ একটা লাইন থেমে থাকে কিন্তু ও দেশে তেমনটা নয়। জুমাইরা লেক টাউন ষ্টেশনে থেকে ট্রাম-এ করে আরো তেরটা স্টেশন পার করে আটলানট্রাস স্টেশনে পৌঁছুলাম। আটলানট্রাস ষ্টেশন থেকে মনোরেলে করে আল ইতিহাদ পার্ক ষ্টেশনে নামলাম। এ জার্নিগুলিতে আমরা মেট্রোরেল, ট্রাম আর মনোরেল সর্ম্পকে বাস্তব ধারণা পেলাম। অবাক করার মতন বিষয়, সবগুলি ষ্টেশনে যন্ত্র নির্ভর ডিজিটাল মেশিন। প্রত্যেকেই প্রত্যেক ষ্টেশনে ইন-আউট হওয়ার সময় কার্ড টাচ করার পর দরজা খুলে। ষ্টেশনে নিজস্ব এত লোকজন নাই বরং দু’একজন সিকিউরিটির দেখা মেলে শুধু সহায়তা করার জন্য। সবাই কি সুন্দর নিয়মমাফিক চলছে! নিময় মেনে চলার দেশে ঘুরে সত্যি আমি অভিভূত। আমি একবার দুষ্টুমী করে আমার সাথে থাকা সচিব স্যারের কার্ড টাচ করার সাথে সাথে আমিও ভিতরে প্রবেশ করলাম। সেন্সরে স্পর্শ হওয়ায় পুরো ষ্টেশনে সিকিউরিটি এ্যালাম বেজে উঠল। সবগুলি মেশিন থেমে গেল। আমরা দাঁড়িয়ে পড়লাম। সিকিউরিটি দৌড়ে আসল। আমরা পর্যটক বুঝতে পেরে, উনি নিজের কার্ড র্চাজ করে ষ্টেশনের সব মেশিন সচল করল। উনার সাথে কথা বলে জানতে পারি, এখানকার আইন খুব কড়া। দুইশত দিরহাম জরিমানা করা হয় যা আমাদের দেশের প্রায় পাঁচহাজার টাকার মতন।

ইতিহাত পার্ক স্টেশনে নেমে আমরা হাতে-মুখে পানি নিয়ে ফ্রেস হলাম। এখানকার প্রত্যেকটা ওয়াসরুমগুলিও যেনো নিয়ম মেনে চলে। বাথ-ট্যাবে টার্চ করলে পানি আসায় পানির অবচয় কম। পর্যাপ্ত টিস্যু, পরিস্কার- পরিচ্ছন্ন, শান্ত- পরিবেশ। আটলানট্রাস পালম এর প্রধান গেট পার হয়ে আমরা ভিতরে প্রবেশ করি। দ্যা লষ্ট চেম্বার এ্যাকুরিয়াম যা তিনদিকে কাঁচে ঘেরা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আর জলজ প্রাণীর, হাজার হাজার রকমের সামুদ্রিক প্রাণীর বিশাল এক আকুয়ারিয়াম। আমরা সেখানে ঘুরেফিরে ঝটপট কিছু ছবি তুলে নিই। সেখান থেকে ওয়াটার পার্কের দিকে যায়। কিন্তু দু:খের বিষয়, আমরা অতিরিক্ত পোষাক সাথে না আনার কারণে ওয়াটার পার্কটা মিস করে গেলাম। এরপর আমরা সমুদ্র পাড় তথা আটলানট্রাস মেইন লবিতে গেলাম। বাঁধাই করা সমুদ্রে তীরে ঘুরলাম, ছবি নিলাম, সেখানে দুপুরে খাবার খেয়ে আরো একটু চারপাশে ঘুরেফিরে বিকেল নাগাদ আমরা এমিরেটস্ মল এর দিকে রওনা হয়। এমিরেটস্ মল বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম একটি মল। এমিরেটস্ মল ঘুরে আমরা দুবাই মলের দিকে যাত্রা করলাম। বিশ্বের বৃহত্তম অট্টালিকা বুরুজ আল খলিফা। সন্ধ্যার পরপর আমরা সেখানে পৌঁছে যায়। সামনের থেকে পানির ফোঁয়ারা, অট্টালিকা’র আলোকসজ্জা, অ্যারাবিয়ান মিউজিক এর তালে তালে মোহনীয় এক রোমাঞ্চকর পরিবেশ। কিছু খেলনা, আতর, কসমেটিকস্ কেনাকাটা করে দুবাই মল থেকেই রাতের খাবার খেয়ে মধ্যরাত পরবর্তী সময়ে আমরা হোটেলের দিকে রওয়ানা দিলাম।

পরদিন আমরা হোটেল ছেড়ে দুবাই এয়ারপোর্টের আসলাম। আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় আমাদের ফ্লাইট দুপুর একটা’র পরিবর্তে বিকেল পাঁচটায় ছাড়বে। আমরা চেকিং, স্কেনিং করার পর ভিতরে ঢুকলাম। আমাদের হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকায় আমরা সমস্ত এয়ারপোর্ট ঘুরে ঘুরে দেখলাম। দুবাই ডিউটি ফ্রী মার্কেট থেকে শেষ মূহুর্তে আরো কিছু কেনাকাটা করলাম। বিকেল পাঁচটায় আমরা দুবাই ছেড়ে আমাদের ফ্লাইট আকাশে উড়ে গেল। নিয়ম মানার দেশ থেকে ঘুরে আসলাম।#

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *