সোমবার, মে ২৭Dedicate To Right News
Shadow

বাজার নিয়ন্ত্রণে আমদানির বিকল্প উদ্যোগ গ্রহণই বেশি জরুরী

Spread the love
  • রেজাউর রহমান রিজভী

দেশের অস্থির বাজার নিয়ন্ত্রণে গত ১৪ সেপ্টেম্বর খুচরা বাজারে প্রতিটি ডিমের দাম ১২ টাকা, আলুর দাম প্রতি কেজি ৩৫ টাকা থেকে ৩৬ টাকা এবং পেঁয়াজের দাম ৬৪ টাকা থেকে ৬৫ টাকা নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু বাস্তবচিত্র পুরোই উল্টো। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঘোষণার পর থেকে বাজারে নতুন দর কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও এই তিন পণ্যই বিক্রি হচ্ছে আগের বাড়তি দামেই। উপরন্তু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের দাপটে কোথাও কোথাও পণ্যের সরবরাহও আগের মতো নেই। বিশেষত আলু নিয়ে তো রীতিমতো তুঘলকি কারবার শুরু হয়েছে।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান মুন্সীগঞ্জের হিমাগার পরিদর্শনের পর দেখতে পান চলতি বছরের এপ্রিলে এই আলুই ২৫ টাকা করে বিক্রি করা হলেও এখন তা ৪০ টাকা কেজি হিসেবে পাইকারী বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে খুচরা বাজারে এই আলুই কোন কোন স্থানে ৫০ টাকা বা তার অধিক দরেও বিক্রি হচ্ছে। এসময় তিনি আলু ২৬ থেকে ২৭ টাকা দরে বিক্রি করতে হবে এমন নির্দেশনা দেন। আর এরপরই দেশের বিভিন্ন জেলায় খুচরা বাজারে আলু বিক্রি বন্ধ করে দেয় আলু মজুদদাররা।
জানা যায়, সরকারি বেঁধে দেয়া দামে আলু বিক্রি করবেন না এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে আলু বিক্রি বন্ধে করে দেয় আলু মজুদদার সিন্ডিকেট। এতে করে পুরো দেশে আলুর সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে অন্যান্য সবজির দামও বেড়েছে কয়েকগুণ। স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টির দ্রুত সমাধান করতে পারবে এমনটিও অনেকে মনে করছেন না। কারণ ইতিপূর্বেও দেখা গেছে যে, ব্যবসায়ীরা নানাভাবে জনসাধারণকে জিম্মি করে ভোগান্তিতে ফেলেন। যার জন্য সরকার ও প্রশাসনকে নানা রকম বিব্রতকর পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। এক্ষেত্রে অন্যান্য সিন্ডিকেট ভাঙার মতো সরকার যদি আলু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আলু আমদানির মতো সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেন তবে অবাক হবো না।
কারণ ইতিপূর্বেও দেখা গেছে, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার শেষ পর্যন্ত আমদানির পথই বেছে নিয়েছে এবং তা প্রতিবারই তাৎক্ষণিক ভাবে তা ফলপ্রসূ হয়েছে। তবে ডলার সংকটের এই দুঃসময়ে সরকার যখন ডলার সাশ্রয়ে নানা প্রকল্প কাঁটছাট করছে, তখন পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও কেবল সিন্ডিকেটের কবল থেকে সাধারণ মানুষকে রেহাই দিতে সরকার যখন আমদানির পথ বেছে নেয়, তখন জনমনে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে, বাজার সিন্ডিকেট কি সরকারের চেয়ে বেশি শক্তিশালী?
আসুন বিষয়টির আরো গভীরে যাওয়া যাক।
কোভিড পরবর্তী সময়ে বিশে^র অর্থনৈতিক অবস্থাকে টালমাতাল করে যে সংকটটি সেটি হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। সংকটটি আরো গভীর হয় যখন রাশিয়ার উপর যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্র দেশগুলো বিধিনিষেধ আরোপ শুরু করে। এ সময় থেকেই মূলত ডলার সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করতে শুরু করে। আর এতে করে দেশে খাদ্য পণ্য আমদানি পূর্বের চেয়ে কমে যায়। মশলা, ফল সহ নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু কিছু খাদ্য পণ্যের আমদানি কম হওয়ায় বাজার ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়।
আর এই সুযোগে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্যের দাম হুট করে আকাশচুম্বী হয়ে পড়ে, যার ভুক্তভুগী হয় আপামর জনগণ। এতে বিশেষত মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণী তীব্র সমস্যার সম্মুখীন হয়।
এমতাবস্থায় বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার নানামুখি উদ্যোগ নেয়। এসব উদ্যোগের মধ্যে ছিলো নিয়মিত বাজার মনিটর করা, পণ্যের দাম বেঁধে দেয়া, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করা, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে মাঠ পর্যায়ে তদারকি করা প্রভৃতি।
কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে একবার যে পণ্যের দাম বেড়েছে তা আর সহজে কমছে না। ফলে বাধ্য হয়েই সরকারকে বিকল্প পথে হাঁটতে হয়। আর এই বিকল্প পথটিই হচ্ছে পণ্য আমদানি করার উদ্যোগ নেয়া। আর এতেই ম্যাজিকের মতো কাজ হচ্ছে। রাতারাতি যে সকল পণ্যের কাম আকাশচুম্বি হয়ে পড়েছিলো, তা আমদানির ঘোষণা হওয়া মাত্রই কমতে শুরু করে। আর এতেই বোঝা যাচ্ছে, ব্যবসায়ীরা আসলে চাইলেই পণ্যের দাম কমাতে পারেন। কিন্তু তারা অধিক লাভের জন্যই জনগণের পকেট কাটছেন।
এখন প্রশ্ন হলো, বাজার নিয়ন্ত্রণে আমদানিই কি তাহলে একমাত্র সমাধান?
এই প্রশ্নের ব্যাপকতা এতোই বেশি যে এর উত্তর এক বা দু’ কথায় পাওয়া যাবে না। এর জন্য আরো গভীরে যেতে হবে।
খুব সাম্প্রতিক একটি বিষয় দিয়েই উদাহরণ দেয়া যাক। দেশে ডিমের দাম হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। কোন বড় ধরণের বিপর্যয় না ঘটলে কোন পণ্যের সংকট বা দাম হুট করে বাড়াটা অস্বাভাবিক। ডিমের ক্ষেত্রে তাই এই অস্বাভাবিকতাকেই সরকার আমলে নিয়ে প্রথমে ডিমের দাম বেঁধে দেন। তবে তাতেও কাজ না হওয়ায় ৪ কোটি ডিম আমদানির অনুমতি প্রদান করে।
এ প্রসঙ্গে ১৮ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য দেশের বাজারে ডিমের দাম কমিয়ে আনা। সে জন্য চারটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি এক কোটি করে ডিম আমদানি করবে। ডিমের দাম না কমা পর্যন্ত আমরা এটা চালিয়ে যাব।’
এর আগে দেশে ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ার পর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ডিম আমদানি করতে অনুমতি চেয়েছিল। বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন যে বাজারে ডিমের দাম না কমলে আমদানির অনুমতি দেওয়া হবে। এরই প্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ডিম আমদানির এ অনুমতি দেয়। আর প্রতিটি ডিমের বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ টাকা।
জানা যায়, ডিম আমদানির ঘোষণার পরই বাজারে ডিমের দাম হালি প্রতি ২ টাকা করে কমে গেছে। তবে এটা সহজেই অনুমেয় যে, যে কোন আমদানি হুট করেই করা যায় না। এজন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আমদানি করার জন্য অনেক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ফলে ৪ কোটি ডিম হুট করেই যে দেশে চলে আসবে সেটিও বলা যাচ্ছে না। তাহলে আমদানি ঘোষণার পর পরই কেন অনেক স্থানে ডিমের দাম কমে গেলো? এটা কি তাহলে ব্যবসায়ীদের তৈরি করা কৃত্রিম সংকট? অবস্থাদৃষ্টে কিন্তু সেটাই সকলের কাছে মনে হবে।
অপরদিকে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশে প্রতিদিন চার কোটি ডিমের চাহিদা রয়েছে। ডিমের ওই চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে এক দিনের চাহিদা পূরণ করা যায়, শুরুতে সেই সংখ্যক ডিম আমদানি করা হবে। আমদানি করা ডিম বাজারে সরবরাহ বাড়াবে এবং অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ী দাম কমিয়ে আনবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট মুরগির খামারের সংখ্যা ২ লাখ ৫ হাজার ২৩১টি। এর মধ্যে নিবন্ধিত খামারের সংখ্যা ৮৫ হাজার ২২৭টি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, করোনা মহামারির আগে দেশে দৈনিক পাঁচ কোটি পিস ডিম উৎপাদন হতো। করোনার সময়ে বেশকিছু মুরগির খামার বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রি সেন্ট্রাল কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে ডিমের উৎপাদন চার কোটি পিসের নিচে নেমে যায়।
তবে ডিম আমদানির সিদ্ধান্তকে ভুল সিদ্ধান্ত মনে করে বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, ‘ডিম আমদানি না করে পোলট্রি ফিড ও মুরগির বাচ্চা আমদানি করা যেতে পারে। এতে উৎপাদন খরচ কমবে, ডিমের দামও কমবে।’ [সময় টিভি অনলাইন: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩]
আমদানি করা ডিমের দামের বিষয়ে বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ অবশ্য বলেছেন, দাম আসলে অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করছে, এখন যদি অনেক বেশি আমদানি করতে দেয়া হয়, তাহলে দাম কমতেও পারে। আর দাম কম না হলে যিনি আমদানি করবেন, তিনি তা করবেন না। কারণ তাকে তো ডিম বাজারে বিক্রি করতে হবে। আমরা যদি মনে করি, ডিম নির্ধারিত দামের নিচে বিক্রি করা যাচ্ছে না, তাহলে আরও আমদানির অনুমোদন দেয়া লাগতে পারে।
তবে বাণিজ্য সচিব এটিও বলেন যে, অবশ্যই আমরা দেশের যুবসমাজের কর্মসংস্থান দেখবো। দেশের মানুষের আর্থিক উন্নয়নে এই শিল্প দেশে গড়ে উঠুক, তা সবাই চায়। সরকারেরও মূল লক্ষ্য এটি। কিন্তু যখন এই সুযোগে বাজার থেকে কেউ বেশি মূল্য নিতে চায় বা ভোক্তাদের জন্য নিত্যপণ্য কেনা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়, তখন আমদানির কথা ভাবতে হবে। আমি মূলত বোঝাতে চাচ্ছি, আমরা আরও আমদানির অনুমতি দেব কি না, তা বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। আমরা প্রতিনিয়তই বাজার মনিটরিং করছি। দরকার হলে আরও আমদানি অনুমতি দেব, দরকার না হলে নাও দিতে পারি। দেশের উৎপাদিত ডিমকে প্রাধান্য দিতে চাই।
একই ঘটনা এর আগে চলতি বছরের মাঝামাঝি আমরা আদার ক্ষেত্রেও দেখেছিলাম। আদার দাম তখন ৪০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। এরপর আদা আমদানি শুরু হলেই বাজারে আদার দাম চলে আসে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা কেজিতে। [দৈনিক কালের কণ্ঠ: ২২ মে]
অনুরূপভাবে চলতি বছরেরই জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে পেঁয়াজের দাম হুট করে বেড়ে ৮০ টাকা হয়ে যায়। সরকারী বিভিন্ন উদ্যোগেও যখন আর কাজ হচ্ছিলো তখন সরকার পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয়। আর সে ঘোষণার পরপরই পেঁয়াজের দাম রাতারাতি কমে যায়। কারণ ভারত থেকে দেশের তিনটি স্থলবন্দর দিয়ে তখন আমদানি করা পেঁয়াজ আসে গড়ে ১৫ টাকা কেজি দরে।
তিন স্থলবন্দরের কাস্টমস স্টেশনের তথ্যে দেখা যায়, প্রতি চালানে প্রতি কেজি পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে ১৩ থেকে ১৬ সেন্টে। ডলারের বিনিময়মূল্য ১০৮ টাকা ১৭ পয়সা ধরে মানভেদে আমদানিমূল্য দাঁড়ায় ১৪ থেকে ১৭ টাকা ৩০ পয়সা। গড়ে দাম পড়ে কেজি প্রতি প্রায় সাড়ে ১৫ টাকা। প্রতি কেজিতে করভার গড়ে সাড়ে ৩ টাকা। এ হিসাবে শুল্ক-করসহ পেঁয়াজ আমদানিতে খরচ পড়ে প্রায় ১৯ টাকা।
দৈনিক প্রথম আলোর ৬ জুন এর এক প্রতিবেদনে হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি ও খান ট্রেডার্সের কর্ণধার হারুন-উর রশীদ তখন জানিয়েছিলেন যে, গরমের কারণে পেঁয়াজ নষ্ট হচ্ছে বেশি। সবকিছু ধরেও প্রতি কেজি ২৫-৩০ টাকার কাছাকাছি খরচ পড়তে পারে। ভোক্তা পর্যায়ে এই পেঁয়াজের দাম ৪০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।
একই সুরে সুর মিলিয়ে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইদ্রিসও বলেন যে, ভারতীয় পেঁয়াজ এখনো খাতুনগঞ্জে বাজারজাত শুরু হয়নি। তবে আমদানির প্রভাবে দেশীয় পেঁয়াজের দাম ৮০-৮৫ থেকে কমে এখন ৫০-৬০ টাকায় নেমে এসেছে।
উল্লেখ্য, পেঁয়াজ আমদানি করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংঘনিরোধ বিভাগ থেকে অনুমতি নিতে হয়। এই অনুমতি নিয়েই ব্যাংকে ঋণপত্র খুলতে পারেন আমদানিকারকেরা। জানা যায়, কৃষকদের স্বার্থে চলতি বছরের মার্চ থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়া বন্ধ করে দেয় কৃষি বিভাগ। তাই গত ১৫ মার্চ থেকে ৪ জুন পর্যন্ত দেশের বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি হয়নি। আর একারণেই দেশে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি করে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীরা, যারা পরবর্তীতে আবারো পেঁয়াজ আমদানি শুরু হলে পেঁয়াজের দাম কমিয়ে দেয়।
এখন তাহলে প্রশ্ন হলো, এই যে পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি করা হলো ও পরবর্তীতে আমদানি শুরু হলে কমিয়ে দেয়া হলো সেটির নেপথ্য কি? আদৌ কি কোন সংকট ছিল? নাকি কৃত্রিম সংকটের অযুহাতে মুনাফার হার দ্বিগুণ-তিনগুণ করাই ছিল অসাধু ব্যবসায়ীদের মূল উদ্দেশ্য?
তবে এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে, আমদানির মাধ্যম এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের পরিকল্পনা বানচাল করা সব সময় সম্ভব হয়। হয়তো সাময়িক ভাবে জনসাধারণের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা যায়, কিন্তু পরবর্তীতে এই সিন্ডিকেটই আবারো বাজারকে অশান্ত করে তোলে। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ কিন্তু এই পেঁয়াজই!
১১ আগস্ট ২০২৩ এর দৈনিক ইত্তেফাকের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, জুন-জুলাই মাসে ৩ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির পরও বাজারে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পেয়ে পেঁয়াজ আমদানির সময় সময় যে রকম দাম ছিল সেটির কাছাকাছি দামেই পেঁয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে।
অথচ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, গত কয়েক বছর ধরে দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক উৎপাদন ৩৫ লাখ টনের বেশি। আর পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ২৮ লাখ টন। উৎপাদন বেশি হলেও আমদানি করতে হয়, কারণ ২৫ শতাংশ বা তারও বেশি উৎপাদিত পেঁয়াজ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা জটিলতায় নষ্ট হয়ে যায়। কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, আমদানিকারকরা গত দুই মাসে ১২ লাখ ৩৪ হাজার টনের বেশি পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি নিয়েছে। যেখান থেকে আমদানি হয়েছে ২৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। এতে করে বাজারে ঘাটতি হওয়ার কথা নয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাজারে পেঁয়াজের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে ও দাম বৃদ্ধি করে অধিক মুনাফা করছে অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। আর এই সব ঘটনা তখনই বন্ধ হবে যখন আমদানি ছাড়াও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন পুরোপুরি তৎপর হবে। বিচ্ছিন্ন ভাবে দুই এক জায়গায় হানা দিয়ে লাভ হবে না। বরং বিশেষত সিন্ডিকেট ভাঙতে পারার মতো সাহসী ভূমিকা নিতে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিদেরকেই বেশি উদ্যোগী হতে হবে। এতে নানাবিধ চাপ আসবে, তবুও সরকারকেই এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। দেশের সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও যখন নিত্যপণ্যেও অস্বাভাবিক মূল্য বাড়াতে ব্যবসায়ীদের সংযমী হবার কথা বলেন, তখন প্রশাসনের তো উচিত তার কথাকে গুরুত্ব সহকারে নিয়ে এসব সিন্ডিকেটের শেকড় উপড়ে ফেলা।
এর পাশাপাশি মন-মানসিকতাতেও ব্যবসায়ীদেরকে আরো উদার হতে হবে। উচ্চ মুনাফা করার বা বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার মানসিকতাও তাদেরকে বদলাতে হবে। পেঁয়াজ ব্যবসায়ী হয়তো সিন্ডিকেট বা সংকট সৃষ্টি করে উচ্চ মুনাফা করলো কিন্তু অপর একটি পণ্যের ক্ষেত্রে পরবর্তীতে তাকেও হয়তো অতিরিক্ত দাম দিতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে লাভের গুড় কিন্তু পিঁপড়াতেই খাবে। আর তাই নিজেদেরকে সংশোধন করার কোন বিকল্প নেই।
আর এসব কিছু সম্ভব হলেই কেবল আমদানি ছাড়াও বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে ও জনগণ স্বস্তিতে থাকবে।

লেখক: রেজাউর রহমান রিজভী, সম্পাদক, দ্য স্টেটমেন্ট২৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *